.
বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদ এমন একজন কবি, যিনি অবহেলিত-দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের হাহাকারকে কবিতায় ধারণ করেছিলেন। অথচ জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁকেও পার করতে হয়েছিল দারিদ্র্য, অসুস্থতা, পারিবারিক শোক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার কঠিন সময়। যাঁর কবিতায় ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, তাঁর নিজের জীবনের শেষ দিনগুলোই হয়ে উঠেছিল এক বেদনাদায়ক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
.
১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরার মাঝাইল গ্রামে জন্ম নেওয়া ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে পরিচিতি লাভ করেন মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসেবে। ১৯৪৪ সালে কলকাতার দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা তাঁর ‘লাশ’ কবিতা তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে। সাহিত্যিক স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু সাহিত্যিক খ্যাতি যে একজন মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তাঁর শেষ জীবন তারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ।
.
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ফররুখ আহমদের কর্মজীবনে সংকট দেখা দেয়। তিনি ঢাকা বেতারে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর চাকরি চলে যাওয়ার ঘটনা তাঁর আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয়। বিষয়টি শুধু একজন কবির কর্মহীন হয়ে পড়ার ঘটনা ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর পরিবারের ভরণপোষণ এবং অসুস্থতা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য।
.
কবির এই সংকটের কথা সাহিত্যিক আহমদ ছফাও তুলে ধরেছিলেন। গণকণ্ঠ পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘ফররুখ আহমদের কী অপরাধ’ শীর্ষক প্রতিবেদন কবির চাকরি-সংক্রান্ত সংকট নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তৈরি করে। তিনি সেখানে লিখেছিলেন-
“খবর পেয়েছি বিনা চিকিৎসায় কবি ফররুখ আহমদের মেয়ে মারা গেছে। এই প্রতিভাধর কবি যাঁর দানে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে—পয়সার অভাবে তাঁর মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে পারেননি, ওষুধ কিনতে পারেননি। কবি এখন বেকার।”
.
ফররুখ আহমদের শেষ জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকগুলোর একটি ছিল তাঁর পরিবারের দুর্দশা। তাঁর এক মেয়ে মারা গিয়েছিল চিকিৎসার অভাবে। একই সময়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনেও আর্থিক দুর্দশা তো ছিলই। তাঁর এক ছেলে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ছিলেন, কিন্তু অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় সেই পড়াশোনাও।
.
একজন বাবার কাছে সন্তানের অসুস্থতা ও মৃত্যু এমনিতেই অসহনীয়। তার ওপর চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকাটা যে কত নির্মম, সেটা সে বাবাই বুঝতে পারে।
.
ফররুখ আহমদের শেষ জীবনের আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবরণগুলোর একটি পাওয়া যায় তাঁর বন্ধু আবু রুশদের স্মৃতিকথায়। কবি জীবনের শেষ দিকে অর্ধাহার ও বিনা চিকিৎসায় দিন কাটিয়েছেন। তাঁর অনুরাগীরা সাহায্য করতে চাইলেও তিনি বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে লিখেছেন আবু রুশদ।
.
সাহিত্যিক আহমদ ছফাও কবির মৃত্যুর পর তাঁর আত্মমর্যাদার প্রসঙ্গটি নিয়ে লিখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ছফা ফররুখ আহমদের ব্যক্তিত্ব ও তাঁর সময়-সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আরও জটিল মূল্যায়ন করেছিলেন।
.
১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনের বাসায় মৃত্যুবরণ করে মুসলিম রেনেসাঁর এই অগ্রদূত। তাঁর বয়স তখন ছিল ৫৬ বছর।










