একজন স্বামী ভালোবাসা দিয়ে স্ত্রীর হৃদয় জয় করেন, আর একজন স্ত্রী শ্রদ্ধা দিয়ে স্বামীর হৃদয় জয় করেন।
দাম্পত্য জীবনের বড় ভুলগুলোর একটি হলো, আমরা ধরে নিই যে আমি যেভাবে ভালোবাসা পেতে চাই, আমার জীবনসঙ্গীও ঠিক সেভাবেই ভালোবাসা চান।
অথচ নারী ও পুরুষের স্বভাবগত পার্থক্য রয়েছে। কুরআনে এসেছে, “আর পুরুষ তো নারীর মতো নয়...” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৩৬)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “নিশ্চয়ই নারীরা পুরুষদের সমকক্ষ ও পরিপূরক।” (জামে আত-তিরমিযী, হাদিস: ১১৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৬)
আধুনিক দাম্পত্য মনস্তত্ত্বের আলোচিত দুটি বই, ড. এমারসন এগেরিচসের Love & Respect এবং লরা ডয়েলের The Surrendered Wife, দাম্পত্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পারস্পরিক সম্পর্ককে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে।
Love & Respect-এর মূল ধারণা হলো, স্বামীর কাছে শ্রদ্ধা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, স্ত্রীর কাছে ভালোবাসা ও নিরাপত্তাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। একজন আরেকজনকে এগুলো দিতে পারলে দাম্পত্যে একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি হয়।
স্ত্রী যখন স্বামীকে সম্মান ও মূল্যায়ন করেন, তখন স্বামীও নিজেকে দায়িত্বশীল ও মূল্যবান মনে করেন। এর প্রভাব পড়ে তাঁর ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও স্ত্রীর প্রতি যত্নে।
আবার স্বামী যখন স্ত্রীকে ভালোবাসা, মনোযোগ ও মানসিক নিরাপত্তা দেন, তখন স্ত্রী নিজেকে মূল্যবান ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মনে করেন। সেখান থেকে স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সহযোগিতাও বাড়তে পারে।
কিন্তু যখন এই চক্রটি ভেঙে যায়, তখন শুরু হয় বিপরীত চক্র। ভালোবাসার অভাবে অসম্মান, আর অসম্মানের কারণে ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যাওয়া। এগেরিচস এটিকে বলেছেন The Crazy Cycle।
কুরআন পুরুষকে পরিবারের দায়িত্ব ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিয়েছে: “পুরুষেরা নারীদের ওপর অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক...” (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৪)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যদি আমি কোনো মানুষকে অপর কোনো মানুষকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।” (জামে আত-তিরমিযী, হাদিস: ১১৫৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৪০)
এখানে সিজদা উপাসনার অর্থে নয়, বরং স্বামীর বিশেষ অধিকারের প্রতি স্ত্রীর গভীর সম্মানের একটি উদাহরণ হিসেবে এসেছে।
লরা ডয়েলের The Surrendered Wife বইয়ে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও মাতব্বরি কমিয়ে তাঁর ওপর আস্থা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
যেমন, স্বামীর প্রতিটি সিদ্ধান্তে সন্দেহ না করে তাঁর বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখা। গাড়ি চালানো, কেনাকাটা কিংবা পারিবারিক কোনো সিদ্ধান্তে প্রতিটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে না চাওয়া।
স্বামী কোনো বিষয়ে ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে “আমি তো আগেই বলেছিলাম” না বলে তাঁকে নিজের ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া। স্ত্রী যেন তাঁর সহধর্মিণী হন, সবসময় শাসনকারী মা হয়ে না ওঠেন।
স্বামী কোনো কাজের উদ্যোগ নিলে “তুমি পারবে না” বলে তাচ্ছিল্য না করে তাঁর চেষ্টা ও সক্ষমতাকে মূল্য দেওয়া। উৎসাহ একজন মানুষকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।
অভিযোগ করার ক্ষেত্রেও ভাষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। “তুমি কখনো সময়মতো ফেরো না” বলার বদলে, “তুমি দেরি করায় এবং কোনো খবর না থাকায় আমি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম” বলা অনেক বেশি কোমল।
“তুমি সবসময় আমার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করো” বলার বদলে, “তোমার এই কথাটিতে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি” বলা অভিযোগকে আক্রমণে পরিণত হতে দেয় না।
আর পরিবারের মানুষ বা বন্ধুদের সামনে স্বামীকে খাটো না করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর যোগ্যতা, চেহারা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে ঠাট্টা করা সম্পর্কের মধ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে স্বামীর দায়িত্ব হলো শুধু সংসারের খরচ বহন করেই ভালোবাসার দায়িত্ব শেষ মনে না করা।
ভালোবাসা মুখেও প্রকাশ করতে হয়। স্ত্রীকে “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলা, তাঁর কাজের প্রশংসা করা এবং তাঁর সৌন্দর্য ও যত্নের মূল্যায়ন করা দাম্পত্যে ভালোবাসার নিশ্চয়তা তৈরি করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ হযরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে ভালোবাসার প্রকাশে বলেছিলেন, “আমার অন্তরে তোমার জন্য ভালোবাসা যেন একটি মজবুত গিঁট।” পরে আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করতেন, “গিঁটের অবস্থা কেমন?” নবীজি ﷺ বলতেন, “আগের মতোই শক্ত।” (হিলয়াতুল আউলিয়া, ২/৪৪)
স্ত্রীর রান্না, ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন কিংবা পরিবারের জন্য করা ছোট ছোট ত্যাগকে স্বাভাবিক ধরে না নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা দরকার।
বিশেষ দিন মনে রাখা, সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দেওয়া কিংবা দুজন মিলে কিছু সময় কাটানোও দাম্পত্যের ভালোবাসাকে সতেজ রাখতে পারে।
আর সময় দেওয়া মানে শুধু একই ঘরে থাকা নয়। স্ত্রী যখন কোনো কথা বলতে চান, তখন মোবাইল সরিয়ে তাঁর দিকে তাকানো, মন দিয়ে শোনা এবং তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও ভালোবাসার অংশ।
অনেক সময় স্ত্রী কোনো সমস্যার সমাধান চান না, শুধু চান তাঁর স্বামী তাঁর কথা শুনুক। তাঁর আবেগ ও ক্লান্তিকে বুঝতে চেষ্টা করাটাই তখন সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হতে পারে।
একটি প্রশান্তিময় পরিবার একজনের একক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে না। স্বামীকে ভালোবাসা দিতে হয়, স্ত্রীকে শ্রদ্ধা দিতে হয়, আবার দুজনকেই একে অপরের প্রয়োজন বুঝতে হয়।
Love & Respect এবং The Surrendered Wife-এর আলোচনার সারকথা হলো, দাম্পত্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে।
আর ইসলামের শিক্ষা আমাদের বহু আগেই শিখিয়েছে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক।