Nazrul Islam Telegram channel photo

Nazrul Islam

@nazruldewPublic Channel

سَمِعۡنَا وَاَطَعۡنَا‌ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَاِلَيۡكَ الۡمَصِيۡرُ আমরা শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনারই ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল। [২:২৮৫]

ধর্মবাংলাভারত

152

Last views

2.2k (2,225 subscribers)
সদস্য
—
Rating
46
Total Posts
Oct 15, 2026, 10:28 AM
আপডেট হয়েছে
Apr 9, 2026
Created
Stats

আপনি বাংলায় বিষয়বস্তু দেখছেন। অন্যান্য ভাষায় বিষয়বস্তু দেখতে সাইটের ভাষা পরিবর্তন করুন।

Channel Information

Channel Information
Channel NameNazrul Islam
Username@nazruldew
Categoryধর্ম
Languageবাংলা
Countryভারত
সদস্য2,225
Channel TypePublic Channel
Created৯ এপ্রি, ২০২৬
Last Updated১৫ অক্টো, ২০২৬ • ৬ দিন আগে
StatusActive

র্যাঙ্কিং

বিশ্বব্যাপী র্যাঙ্কিং
#134113+411
ভাষার র্যাঙ্কিং
#357-2
ক্যাটাগরির র্যাঙ্কিং
#2341+6

অংশগ্রহণকারীদের বৃদ্ধি

মোট: 2.2K30 Days growth: +200.9%
09/1609/2109/2610/0110/0610/1110/15
অংশগ্রহণকারীদের বৃদ্ধি - 30 Days
DateSubscribers
16:09:20262,205
17:09:20262,205
18:09:20262,227
19:09:20262,227
20:09:20262,227
21:09:20262,227
22:09:20262,227
23:09:20262,227
24:09:20262,227
25:09:20262,227
26:09:20262,227
27:09:20262,227
28:09:20262,227
29:09:20262,227
30:09:20262,227
01:10:20262,227
02:10:20262,227
03:10:20262,227
04:10:20262,227
05:10:20262,227
06:10:20262,227
07:10:20262,227
08:10:20262,227
09:10:20262,227
10:10:20262,227
11:10:20262,227
12:10:20262,227
13:10:20262,227
14:10:20262,227
15:10:20262,225
অংশগ্রহণকারীদের বৃদ্ধি - Weekly
DateSubscribers
Week of 06:04:20262,274
Week of 13:04:20262,274
Week of 20:04:20262,274
Week of 27:04:20262,249
Week of 04:05:20262,249
Week of 11:05:20262,225
Week of 18:05:20262,225
Week of 25:05:20262,225
Week of 01:06:20262,225
Week of 08:06:20262,199
Week of 15:06:20262,199
Week of 22:06:20262,199
Week of 29:06:20262,184
Week of 06:07:20262,184
Week of 13:07:20262,184
Week of 20:07:20262,184
Week of 27:07:20262,184
Week of 03:08:20262,158
Week of 10:08:20262,158
Week of 17:08:20262,153
Week of 24:08:20262,141
Week of 31:08:20262,141
Week of 07:09:20262,205
Week of 14:09:20262,227
Week of 21:09:20262,227
Week of 28:09:20262,227
Week of 05:10:20262,227
Week of 12:10:20262,225
অংশগ্রহণকারীদের বৃদ্ধি - Monthly
DateSubscribers
April 20262,249
May 20262,225
June 20262,199
July 20262,184
August 20262,141
September 20262,227
October 20262,225
অংশগ্রহণকারীদের বৃদ্ধি - Yearly
DateSubscribers
20262,225

Top 10 posts

Most viewed posts from this channel

By views
  1. #1কী নিখুঁত ও মাথাঠাণ্ডা টার্গেট!2.1K
  2. #2দেশ ও জমিনের প্রতি যদি ন্যুনতম দায়বদ্ধতা থাকে তাহলে অবশ্যই আপনাকে দিল্2.0K
  3. #3Post #3651.1K
  4. #4বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত ইউএসের মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌ1.0K
  5. #5কিছু পাপ আছে এমন যেটা করলে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক দুটোই নষ্ট হয়। তন1.0K
  6. #6এই বর্বর রাজনীতির পথ বন্ধ করে দিতে হবে901
  7. #7গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার আলাপ কেন নিয়ে আসে কিছু লোক তা821
  8. #8দ্বিমত করার সুযোগ নেই।798
  9. #9প্রচলিত কোর্টে মামলার রায়ে যে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করা হয় তা কখনোই শর'ঈ 685
  10. #10জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষমতা রাখেন। ফলে আইনি মারপ্যাঁচে মামলা দীর্ঘায়িত করা675

সাম্প্রতিক পোস্ট

Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১২ অক্টো, ২০২৬, ২১:৩২

সবাই দুধ শিশু খুঁজছিলেন। এই বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি, এই পাড়া থেকে ঐ পাড়া। শিশুর সন্ধান পাচ্ছিলেন না।

এভাবে খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা অনেক দূর চলে গেলেন। সেই বছরটা ছিল ঘোর অজন্মার। চারদিকে খাইখাই রব। মুখে খাবার ছিল না। পরনে ভালো কাপড় ছিল না। গাছে ফুল-ফল ছিল না। খেতখামারে ফসল ছিল না। উটের পালানে দুধ ছিল না। মেষগুলো ক্ষুধার জ্বালায় হাঁটতে পারছিল না। আকাশে মেঘ ছিল না। বৃষ্টি হওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিল না। সূর্যের তাপে পুড়ছিল সবকিছু। গাছ শুকিয়ে কাঠ হয়েছিল। মানুষ না খেতে খেতে শুকিয়ে কংকালসার হয়েছিল। চরম অশান্তি চারদিক থেকে অক্টোপাসের মতো ঝাপটে ধরেছিল।

বহু পথ, বহু মোড় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এক দুধ-শিশুর সন্ধান তাঁরা পেল। সেই শিশুকে নেওয়ার জন্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সে বলে, আমি নিব। ও বলে, আমি নিব। এই এক আজব প্রতিযোগিতা। কিন্তু যখন তাঁদেরকে জানানো হয় যে, শিশুটির পিতা নেই তখন আর কেউ নিতে চায় নি। কেউ না। মুখ কালো করে ফিরে আসে। পিতার কাছ থেকে ভালো পারিতোষিক তাঁরা আশা করতো। অথচ পিতা নেই। কার কাছে চাইবে টাকা? কে পূরণ করবে তাঁদের দাবী দাওয়া?  শুধু শুধু নিয়ে  কী লাভ? এমনিই চলছে মহা অভাব। কেউ নেয়নি। অন্যদিকে চলে গেল— ভিন্ন মহল্লায়। 

বহু খোঁজাখুঁজির পর একসময় ঐ দলের সবাই এক একটি করে দুধ-শিশুর সন্ধান পেয়ে যায়—কিন্তু আবু যুয়াইবের কন্যা একটিও পায় নি। খালি হাত। মনটা ভীষণ বেজার। সে তাঁর স্বামীকে বললো ' ওগো! আমার শূন্য হাতে ফিরে যেতে একদম ভালো লাগছেনা। আল্লাহর কসম!! আমি ঐ এতিম শিশুকেই নিব।'
স্বামী জবাব দিলেন, 'নিতে পার। হয়ত আল্লাহ তাঁর মধ্যেই তোমার জন্য কল্যাণ রেখেছেন।'

স্বামীর সম্মিত পেয়ে আবু যুয়াইবের কন্যা সোজা চলে গেলেন এতিম শিশুর বাড়িতে। দাদা আর মা'র সাথে কথা পাকা করে কোলে তুলে নিলেন শিশুকে। শিশুকে কোলে নেয়ার সাথে সাথে তাঁর বুক দুধে ভরপুর হয়ে গেল। অথচ একটু আগেও সাথে থাকা বাচ্চা একফোঁটা দুধ বের করতে পারে নি। কতোবার চুষেছে আর কেঁদেছে সেই হিসাব কে রাখে? ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করেছিল। এখন নিজের বাচ্চা আর পালক বাচ্চা দুধ খেয়েও শেষ করতে পারছে না। 

তাঁরা উটের কাছে গিয়ে দেখেন দুধে ফুলে গেছে উষ্ট্রীর  পালান। যেই গাধায় চড়ে তিনি এসেছিলেন সেই গাধা এখন নওজোয়ান। কী শক্তি, কী তেজ, কী ক্ষিপ্রতা! সবার আগে চলতে লাগল সেই দুর্বল গাধা। বাড়িতে গিয়ে দেখে মেষ পালের বিরাট পরিবর্তন। প্রতিটি মাদী মেষের পালান দুধে ভর্তি। কী আনন্দ, কী স্বাচ্ছন্দ্য! তাঁদের হাসি থামছেইনা!
অন্যদের সেই করুণ অবস্থা তখনো বিরাজমান। হাহাকার লেগেই আছে। এভাবেই এই ছোট শিশুর বরকতে তাঁর সংসার প্রাচুর্য, সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠলো। সে হলো অনন্য। পৌঁছে গেল অনন্য উচ্চতায়-- দুনিয়া এবং আখেরাতে।

সেই ভাগ্যবান মহিলা--- হযরত হালিমা রা. আর সেই মহামান্য শিশু আমাদের প্রাণের নবী হযরত মুহাম্মদ সা.।
মুহাম্মদ ﷺ তখনও নবী হননি। তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়নি। পৃথিবীর মানুষ তখনও জানত না, এই ছোট্ট শিশুটিই একদিন শেষ নবী হিসেবে সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়াতের বার্তা নিয়ে আসবেন।

কিন্তু তাঁর জীবনের একেবারে শুরু থেকেই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের কিছু নিদর্শন প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। মরুভূমির নীরব বুকে  বনু সা'দের সেই ছোট্ট পরিবারে এক এতিম শিশু বেড়ে উঠতে লাগলেন।

তাঁর চারপাশের মানুষ তখন শুধু একজন শিশুকে দেখছিল। এই শিশুই যে একদিন অন্ধকার জমিনে আলোর মশাল জ্বালাবেন, সেই বোধটুকু ছিল না তাদের। কিন্তু আল্লাহ জানতেন—এই শিশুর জন্য অপেক্ষা করছে এক বিশাল ভবিষ্যৎ। তাঁর দাপটেই কাঁপবে রোম, পারস্য সহ তৎকালীন সব পরাশক্তি। 

একদিন তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হবে তাওহিদের আহ্বান। তাঁর হাতে মানুষ পাবে কুরআনের আলো। তাঁর জীবন হয়ে উঠবে মানবতার জন্য আদর্শ। আর তাঁর নাম উচ্চারিত হবে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাঁর নাম শুনেই আবেগে কাঁদবে কোটি মুসলিম। 'মুহাম্মদ' শোনার পরপরই অতি সম্মানের সাথে সমস্বরে বলে উঠবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

মুহাম্মদ ﷺ-এর শৈশবের সেই প্রথম দিনগুলো তাই শুধু শৈশবের গল্প নয়। এগুলো এক মহামানবের আগমনের পূর্বকথা। এক মহান দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত হতে থাকা এক শিশুর জীবনের প্রথম অধ্যায়।
1520010
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১২ অক্টো, ২০২৬, ২১:৩২

পর্ব: ১১

মক্কার আকাশে তখনও সেই মহিমান্বিত দিনের কোনো দৃশ্যমান ঘোষণা আসেনি। কিন্তু ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছিল এক মহান আগমনের জন্য। এমন এক ব্যক্তিত্ব পৃথিবীতে আসতে চলেছেন, যাঁর মাধ্যমে অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবজাতি হেদায়াতের আলো খুঁজে পাবে।

গোত্রীয় বিভাজন, পৌত্তলিক সংস্কৃতি এবং তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর পরোক্ষ প্রভাবের পটভূমিতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর আগমন কেবল একজন ব্যক্তির জন্মমাত্র ছিল না; বরং তা ছিল মানব ইতিহাসের এক নতুন আধ্যাত্মিক ও সভ্যতাগত যুগের সূচনাবিন্দু।
তিনি মুহাম্মদ ﷺ।

তিনি ছিলেন কুরাইশের সম্মানিত বংশের সন্তান। তাঁর বংশধারা গিয়ে মিলেছে কুসাই ইবন কিলাবের কাছে। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ। পিতামহ আবদুল মুত্তালিব। তাঁর পর হাশিম। তারপর আবদ মানাফ। এরপর কুসাই ইবন কিলাব। মক্কার মর্যাদাপূর্ণ কুরাইশ বংশের এই ধারাতেই তাঁর জন্ম।

তাঁর পিতা আবদুল্লাহর সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল আমিনা বিনতে ওয়াহবের। মা আমিনার পরিবার ইয়াসরিবে বসবাস করত। বিবাহের অল্প কিছুদিন পরেই আবদুল্লাহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাফেলায় যোগ দিয়ে শামের  উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ​বাণিজ্য শেষে মক্কায় ফেরার পথে আবদুল্লাহ ইয়াসরিবে অবস্থানকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
তখন আমিনা তাঁর গর্ভে সন্তান ধারণ করছিলেন।

সন্তানের জন্মের আগেই পিতা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তাই মুহাম্মদ ﷺ পৃথিবীতে এলেন পিতৃহারা হয়ে। তাঁর জীবনের প্রথম পরিচয়গুলোর একটি ছিল—তিনি একজন এতিম শিশু। কিন্তু মানুষের দৃষ্টিতে এটি ছিল অভাব, সমাজের দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব। আল্লাহর পরিকল্পনায় ছিল গভীর হিকমত।
তাঁর জন্ম হয়েছিল হাতির বছরে। সেই বছরই ইয়েমেনের শাসক আবরাহা বিশাল এক বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে এগিয়ে এসেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল কাবা ধ্বংস করা। তার বাহিনীতে ছিল ১৩টি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতি। এতে নাম হয়ে যায় হস্তিবাহিনী। কিন্তু কাবার রব তাঁর ঘরকে রক্ষা করলেন। আবরাহা ধ্বংস হল। পচেগলে শেষ হল তার ৭০ হাজার সদস্যের বাহিনী। সেই ঐতিহাসিক বছরেই জন্ম নিলেন নবী মুহাম্মদ ﷺ। অন্ধকার ধরণীতে আলোকছটা। 

জন্ম হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে। বারটি ছিল সোমবার। তাঁর জন্মতারিখের নির্দিষ্ট দিন নিয়ে সীরাতবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে রবিউল আউয়াল মাস এবং সোমবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল—এ কথা প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী বর্ণনাগুলোতে পাওয়া যায়।

তাঁর মা আমিনা গর্ভাবস্থায় সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। দুয়াটা শিখেছিলেন ঐশ্বরিক আওয়াজ থেকে। তাঁকে বলা হয়েছিল যে, গর্ভে সন্তান আসলে যেন পড়ে, أُعِيذُهُ بِالْوَاحِدِ مِنْ شَرِّ كُلِّ حَاسِدٍ। হিংসুকের অনিষ্ট থেকে তিনি তাঁর সন্তানের জন্য সেই মহান সত্তার আশ্রয় চাইতেন, যিনি সবকিছুর মালিক।

মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্মের সময় ইয়াসরিবেও একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। সাহাবি হাসসান ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন ছিলেন ছোট শিশু। তাঁর বয়স প্রায় সাত বছর। তিনি ইয়াসরিবে ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে স্মরণ করে বলেন, এক ইহুদি আলেমকে তিনি শহরের একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে শুনেছিলেন—আহমাদের নক্ষত্র উদিত হয়েছে।

সে আলেম বলেছিল, এই নক্ষত্র কোনো সাধারণ সময়ের নক্ষত্র নয়। কোনো নবীর জন্মের সময়ই এটি দেখা যায়। এদিকে মক্কায় নবজাতক শিশুটিকে ঘিরে ছিল আরেকটি ঘটনা। নাম রাখা নিয়ে ছিল সেই ঘটনা। আরবীয় প্রথা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এক্ষেত্রে। তাঁর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখলেন—মুহাম্মদ।

নামটি তখন আরবদের মধ্যে খুব বেশি পরিচিত ছিল না। তাই লোকেরা বিস্মিত হয়েছিল। কেন এমন একটি নাম রাখা হল? আবদুল মুত্তালিবের প্রত্যাশা ছিল—এই শিশুর প্রশংসা আসমানে এবং পৃথিবীতে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে।

তিনি বলেছিলেন—আল্লাহর কসম! আমার বংশের এই সন্তান একদিন মহান মর্যাদার অধিকারী হবে। দুনিয়া তাঁর পদতলে আছড়ে পড়বে। কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর সেই নাম শুধু মক্কার একটি পরিবারের নাম হয়ে রইল না। চারদিকে এর সুভাস ছড়িয়ে পড়ল। বাতিলরা আতঙ্কিত হতে থাকল। মজলুমরা পেতে থাকল পরম আশ্রয়। পৃথিবীর ইতিহাসে মুহাম্মদ নামটি এক অনন্য মর্যাদা লাভ করল। দুনিয়া সৃষ্টির পর থেকে এমন আধিপত্য আর কেউ-ই বিস্তার করতে পারে নি। 

সে সময় মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর একটি প্রচলিত রীতি ছিল, তারা নিজেদের শিশুদের মরুভূমির কোনো বেদুইন পরিবারের কাছে লালন-পালনের জন্য দিয়ে দিত। মরুভূমির নির্মল পরিবেশে শিশুর শরীর শক্ত হতো। মুক্ত বাতাসে সে বেড়ে উঠত। আরবি ভাষার বিশুদ্ধ ও সাবলীল রূপও সেখানে শেখা যেত।

ইয়াসরিবের একদল মহিলা দুধ-শিশুর সন্ধানে বের হলেন। সাথে আবু যুয়াইবের কন্যা ছিলেন। তাঁর সাথে ছিল স্বামী এবং নিজের দুগ্ধপোষ্য শিশু। অন্যের দুধ লালন পালন করেই তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করতেন। এটাই ছিল তাঁদের অন্যতম পেশা। পোষ্য শিশুর বাবা মা'র কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা কড়ি পেতেন। অভাব মোচন হতো অনেকটা।
145000
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১৪ সেপ, ২০২৬, ২১:১৭

আল্লাহ তাকে দশটা ছেলেই দিলেন। তাদের মধ্যে আব্বাস ও হামজা পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবু তালেব, যার আসল নাম আবদে মানাফ, আর আবু লাহাব, যার আসল নাম আবদুল উযা, তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। আর হারিস, যুবাইর, হাজল, মুকাওয়্যিম, দিরার ও আবদুল্লাহ ইসলাম আসার আগেই মারা গিয়েছিলেন।

দশ ছেলে বড় হলে আবদুল মুত্তালিব তার মানত পূরণ করতে কাবায় গেলেন। সেখানে তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করা হতো, যাকে বলে আজলাম। তিনি দশ ছেলের নামে তীর ছুড়লেন। প্রতিবার তীর এসে পড়ল তার সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে প্রিয় ছেলে আবদুল্লাহর নামে।

তিনি মনে মনে চাইছিলেন অন্য কারো নাম আসুক, কিন্তু বারবার আবদুল্লাহর নামই আসছিল।

কুরাইশ নেতারা এসে বলল, এই কাজ কোরো না। যদি তুমি ছেলেকে জবাই করো, তাহলে এটা একটা নিয়ম হয়ে যাবে। মানুষ ছেলেদের জবাই করতে শুরু করবে।

তারা আবার সেই বনু সা'দের মহিলা গণকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিল।

গণক সব শুনে বলল, তোমাদের এখানে মানুষের রক্তপণ বা দিয়াত কত? তারা বলল, দশটা উট। গণক বলল, তাহলে এক কাজ করো, একদিকে আবদুল্লাহর নাম, আরেকদিকে দশটা উটের নাম লিখে তীর ছোড়ো। যদি আবদুল্লাহর নাম আসে, তাহলে দশটা উট বাড়াও। এভাবে বাড়াতে থাকো, যতক্ষণ না উটের নাম আসে।

শুরু হলো গণনা।

প্রথমবার তীর আবদুল্লাহর নামে, বিপরীতে দশ উট। দ্বিতীয়বারও আবদুল্লাহর নামে, বিপরীতে বিশ উট। এভাবে নব্বই উট পর্যন্ত প্রতিবার আবদুল্লাহর নামই আসতে লাগল।

দশমবার যখন একশো উটের নামে তীর ছোড়া হলো, তখন তীর উটের নামে পড়ল।

আবদুল মুত্তালিব আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন, কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি আরও দুইবার তীর ছুড়লেন। দুইবারই তীর উটের নামে পড়ল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরবের রক্তপণ বা দিয়াতের মান ১০ উট থেকে উন্নীত হয়ে ১০০ উটে গিয়ে দাঁড়ায়, যা পরবর্তীতে ইসলামেও স্বীয় স্থানে বহাল রাখা হয়।

তখন তিনি একশো উট কোরবানি দিলেন। সেগুলোর গোশত মক্কার সকল অধিবাসী ও বন্য পশুপাখির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আর আবদুল্লাহ বেঁচে গেলেন।

পরে এই আবদুল্লাহর সাথেই আমিনা বিনতে ওয়াহাবের বিয়ে হল, আর তাদের ঘরেই জন্ম নিলেন মুহাম্মদ ﷺ।

এজন্যই নবীজি ﷺ বলতেন, আমি দুই জবাই হওয়া ব্যক্তির সন্তান। একজন হলেন আমার পিতা আবদুল্লাহ, আরেকজন হলেন আমার পূর্বপুরুষ ইসমাইল, যাকে ইবরাহিম আ. জবাই করতে গিয়েছিলেন।
3980013
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১৪ সেপ, ২০২৬, ২১:১৭

সীরাহ—১০

আবদুল মুত্তালিব — রাসূল ﷺ এর দাদা। তার জীবনের দুটো ঘটনা পুরো আরবের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এক, হারিয়ে যাওয়া জমজম কূপ ফিরে পাওয়া। দুই, নিজের কলিজার টুকরো ছেলে আবদুল্লাহকে কুরবানি করা থেকে বাঁচানো। এই দুটো ঘটনাই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা, যার শেষ মাথায় ছিল মুহাম্মদ ﷺ এর আগমন।

জমজম তো সেই হাজেরা আ.-এর সময় থেকেই ছিল। পরবর্তীতে জুরহুম গোত্রের ওপর এর দেখভালের দায়িত্ব আসে। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কাবার দায়িত্বে থাকার পর জুরহুম গোত্রের মধ্যে চরম নৈতিক অবক্ষয়, কাবার মালপত্র আত্মসাত এবং হজযাত্রীদের ওপর অত্যাচার বৃদ্ধি পায়। জুরহুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে খুযা'আহ গোত্র। তাদের বিপ্লবে টিকতে পারে নি জুরহুম।

যখন জুরহুম গোত্র মক্কা ছেড়ে চলে যায়, তারা শত্রু খুযাআহ যেন পানিটা না পায়, তাই কূপটা মাটি চাপা দিয়ে, তার ভেতর কাবার সোনা-দানা আর তলোয়ার ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিল। এরপর শত শত বছর কেউ জানত না জমজম কোথায়। মানুষ জানত, জমজম অবশ্যই আছে কোথাও, কিন্তু জায়গাটা হারিয়ে গিয়েছিল।

আবদুল মুত্তালিব তখন কাবার কাছেই ঘুমাতেন। এক রাতে স্বপ্নে কে যেন বলল, "তাইয়্যিবা খনন করো।" তিনি জেগে গেলেন, বুঝলেন না তাইয়্যিবা কী।

দ্বিতীয় রাতে আবার স্বপ্নে বলল, "বাররা খনন করো।" এবারও বুঝলেন না আসল রহস্য।

তৃতীয় রাতে বলল, "মাদমুনা খনন করো।" উঁহু, এবারও অন্ধকারে।

চতুর্থ রাতে যখন বলল, "জমজম খনন করো," তখন সাথে তিনটা আলামতও দিয়ে দেওয়া হল।

১. জমজম সেখানে, যেখানে রক্ত আর নাড়িভুঁড়ি। মানে যেখানে কোরবানির পশু জবাই হয় আর তার ময়লা ফেলা হয়, তার মাঝখানে।

২. জমজম সেখানে, যেখানে সাদা ডানার কাক ঠোকরায়। আরবিতে বলে আল-গুরাব আল-আসাম। কালো কাক, যার ডানায় একটা সাদা পালক আছে।

৩. যেখানে পিঁপড়ার ঢিবি বা কলোনি আছে।

পরদিন আবদুল মুত্তালিব তার একমাত্র ছেলে হারিসকে নিয়ে কাবার কাছে ঘুরছিলেন। দেখলেন, একটা গরুকে আনা হয়েছে ইসাফ ও না'ইলা মূর্তির সন্নিকটে। তৎকালীন মক্কায় এখানেই পশুবলি দেওয়া হত। গরুটা ছুটে পালাল। কাবার চত্বরে রক্ত ছড়িয়ে পড়ল। আর এক জায়গায় গিয়ে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই একটা সাদা ডানার কাক এসে সেই নাড়িভুঁড়ির পাশে, পিঁপড়ার ঢিবির উপর বসল।

আবদুল মুত্তালিব বুঝে গেলেন, এই সেই জায়গা। তিনি কোদাল নিয়ে খোঁড়া শুরু করলেন।

কুরাইশরা ছুটে এলো। বাধা দিল সম্মিলিত শক্তিতে। বলল, কাবার পাশে এসব খোঁড়াখুঁড়ি চলবে না। এটা চরম বেয়াদবি। কিন্তু তিনি থামলেন না। খুঁড়তে খুঁড়তে যখন পাথর দিয়ে বাঁধানো পুরনো কূপের মুখ বের হল, তিনি চিৎকার করে বললেন, আল্লাহু আকবার। তখন কুরাইশ বুঝল, তিনি জমজম পেয়ে গেছেন।

তারা বলল, এই সম্মানে আমাদেরও ভাগ আছে। এটি আমাদের সর্বজনীন পিতৃপুরুষ ইসমাইল (আ.)-এর কূপ, সুতরাং বনু হাশিম একা এর মালিক হতে পারে না। আবদুল মুত্তালিব বললেন, "না, এটা আমার পরিবারের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদা। এটা আমার হক।" সৃষ্টি হল মতবিরোধ। আরবের মতবিরোধ মানেই তুমুল ঝগড়া।

এই ঝগড়া মেটাতে তারা ঠিক করল, ইয়াসরিবে বনু সা'দের এক মহিলা গণকের কাছে যাবে। সেই গণক ফয়সালা দেবে, কূপ কার।

পথে মরুভূমিতে আবদুল মুত্তালিবের পানি শেষ হয়ে গেল। তিনি কুরাইশদের কাছে পানি চাইলেন। তারা বলল, আমাদের পানিও কম, দিতে পারব না।

মৃত্যু যখন নিশ্চিত, আবদুল মুত্তালিব বললেন, আমরা নিজেদের কবর নিজেরা খুঁড়ি। যাতে একজন মারা গেলে আরেকজন তাকে দাফন করতে পারে। অন্তত লাশটা দাফন করা যাবে, যাতে মরেও দুনিয়ার চোখে অসম্মানিত না হতে হয়। সবাই কবর খুঁড়ল, মৃত্যুর অপেক্ষায় বসল। শরীর নড়ে না। পানিশূন্যতা দেহের স্বাভাবিকতা শেষ করে দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর আবদুল মুত্তালিব নেতৃত্বসুলভ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বললেন, এভাবে বসে মরা তো কাপুরুষের কাজ, চলো পানি খুঁজি। তিনি উটের উপর উঠতে গেলেন। উটটা যখন উঠে দাঁড়াল, তখন তার পায়ের খুরের নিচ থেকে পানির ফোয়ারা বের হতে লাগল। স্বচ্ছ সুপেয় পানি।

এই দৃশ্য দেখে কুরাইশরা বলে উঠল, যিনি তোমাকে এই মরুভূমির মাঝে পানি দিলেন, তিনিই তোমাকে জমজম দিয়েছেন। জমজম তোমারই। ঝগড়া করলাম শুধুই। তারা আর ঝগড়া না করে ফিরে এলো। সেদিন থেকে হাজিদের পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব একমাত্র আবদুল মুত্তালিবের হয়ে গেল।

জমজম খোঁড়ার সময় আবদুল মুত্তালিবের সাথে ছিল শুধু এক ছেলে। জনবল ও নিজস্ব জনসমর্থনের বড্ড অভাব অনুভব করেছিলেন তখন। কুরাইশরা যখন তাকে ঘিরে ধরেছিল, তখন তিনি নিজের অসহায়ত্ব টের পেলেন ভালোই। তখন তিনি মানত করলেন, আল্লাহ যদি আমাকে দশটা ছেলে দেন, যারা বড় হয়ে আমার পাশে দাঁড়াবে, তাহলে আমি একটাকে কোরবানি দিব।
348003
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১২ সেপ, ২০২৬, ২১:০৬

মক্কার ইতিহাসটা কোনো শান্ত নদীর নীরব ইতিহাস না। এটা দখল, বেদখল আর রক্তের ইতিহাস। ইতিহাসের চাকা ঘুরেই একটা ঘরকে কেন্দ্র করে — কাবা। যার হাতে কাবা, তার হাতেই আরবের ক্ষমতা।

ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক মা আর এক শিশুকে দিয়ে। মা হাজেরা আর তার কলিজার টুকরো ইসমাইল আ.। মরুভূমির মাঝখানে জমজম ফোয়ারার মতো ফুটে উঠল, আর সেই পানির টানে গড়ে উঠল মক্কা। জমজমের কল্যাণে জমে উঠল একটি উপত্যকা। কাবা দিল সেই নির্জন উপত্যকার পূর্ণতা। ইসমাইল আ.-এর হাতেই ছিল এই ঘরের প্রথম চাবি।

কিন্তু ক্ষমতা বেশিদিন এক জায়গায় থাকে না।

ইসমাইল আ.-এর পর মক্কা গেল জুরহুম গোত্রের হাতে। তাদেরকে সরিয়ে দিল খুযাআহ গোত্র। আর খুযাআহর এক নেতা ছিল, আমর ইবনে লুহাই। সে-ই প্রথম মক্কায় মূর্তি নিয়ে আসল। ইসমাইল আ.-এর এক আল্লাহর ঘরে সে তিনশ ষাটটা মূর্তি বসিয়ে দিল। তাওহিদের শহরটা হয়ে গেল শিরকের রাজধানী।

দূর থেকে এই দৃশ্য দেখছিল এক যুবক। বুকে কর্তৃত্ব হারানোর ব্যথা। নাম কুসাই ইবনে কিলাব। সে ছিল ইসমাইল আ.-এর বংশধর, ফিহিরের সন্তান, যার থেকেই কুরাইশের শুরু। কুসাইয়ের রক্তে ছিল মক্কার দাবি। জেগে ওঠার প্রেরণা। সে বুঝল, এই ঘর খুযাআহর না, এই ঘর আমাদের। এটা ইসমাইলের সন্তানদের হক।

সে গোত্রগুলোকে এক করল। মক্কা কোথা থেকে কোথা গেল, বিস্তারিত বলল। পুনরুদ্ধারের শপথ নিল সবাই মিলে। তারপর যুদ্ধ করে খুযাআহকে মক্কা থেকে বের করে দিল। যেন বলছিল—তোদের এখানে মাতব্বরি করার অধিকার নেই, এটা আমাদের জায়গা, আমাদের পিতৃপুরুষদের হাতে গড়া মক্কা। বহু বছর পর কাবার চাবি আবার ফিরে এলো ইসমাইল আ.-এর বংশের হাতে।

মক্কা জয় করেই কুসাই বুঝল, শুধু তলোয়ার দিয়ে শহর চলে না, শহর চালাতে লাগে সিস্টেম। সে কাবার পাশেই একটা ঘর বানাল। নাম দিল দারুন নাদওয়া।

এটাই ছিল আরবের প্রথম পার্লামেন্ট। এখানেই কুরাইশ নেতারা বসে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিত, দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা করত, শান্তির সিদ্ধান্ত নিত। কারো বিয়ে হলে এখানেই অনুষ্ঠান হত। আবার এই ঘরেই বহু বছর পর কুরাইশরা একদিন একসাথে বসে মুহাম্মদ ﷺ কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, তার হিজরতের আগের রাতে। দারুন নাদওয়ার সবচেয়ে কুৎসিত রূপ এটিই। তখন থেকেই দারুন নাদওয়া সবচেয়ে নিকৃষ্ট।

কুসাই শুধু ঘর বানিয়েই থেমে থাকল না। সে পুরো মক্কার ম্যানেজমেন্ট ভাগ করে দিল। হাজিদের পানি কে খাওয়াবে, খাবার কে দেবে, কাবার চাবি কার কাছে থাকবে — সব দায়িত্ব সে তার দুই ছেলে আবদুদ দার আর আবদে মানাফের মধ্যে ভাগ করে দিল।

এই দারুন নাদওয়ার শেষ পরিণতিটাও এক অদ্ভুত গল্প। ইসলামের পর এই ঘরের মালিক হলেন হাকিম ইবনে হিযাম, যিনি ছিলেন আবদুদ দারের বংশের আর নবীজির ﷺ সাহাবি। মুয়াবিয়া রা. যখন খলিফা, তখন হাকিম রা. এই ঘরটা তার কাছে এক লাখ দিরহামে বিক্রি করে দিলেন।

লোকেরা বলল, হায় হায়, মক্কার সম্মান বিক্রি করে দিলেন? হাকিম হেসে বললেন, মক্কার সম্মান কি ইট-পাথরে? বানানো বৈঠকখানায়? সম্মান তো তাকওয়ায়। আর সেই এক লাখ দিরহাম পুরোটাই তিনি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলেন।

এবার ফিরে আসি বংশের গল্পে। কুসাই থেকে কীভাবে মুহাম্মদ ﷺ পর্যন্ত এলো।

কুসাইয়ের ছেলে আবদে মানাফ। তার ছেলে হাশিম। হাশিম ছিল মক্কার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী, সবচেয়ে দানশীল। তার একটা ছেলে হল, নাম শায়বা।

জন্মের সময় তার চুল অন্য দশটা বাচ্চার মতো ছিল না৷ একটু ভিন্ন। চুলের বড় একটা অংশ ছিল সাদা। এই অনন্যতা দেখেই তার নাম রাখা হয় শায়বা। শায়বা মানে শুভ্রতা।

হাশিম মারা গেল মদিনায়। খবর শুনে তার ভাই মুত্তালিব ছুটে গেল মদিনায়, ভাতিজা শায়বাকে আনতে। মুত্তালিব যখন শায়বাকে নিয়ে মক্কায় ঢুকছে, মক্কার লোকেরা ভাবল, মুত্তালিব বাজার থেকে একটা গোলাম কিনে এনেছে। তারা বলতে লাগল, ওই দেখো, আবদুল মুত্তালিব — মুত্তালিবের গোলাম।

মুত্তালিব বলল, আরে না, এ আমার ভাতিজা। কিন্তু নামটা আর মুছল না। মুখের নাম ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিল। শায়বা হয়ে গেল আবদুল মুত্তালিব।

আর সেই আবদুল মুত্তালিবের ছেলে আবদুল্লাহ, আর আবদুল্লাহর ছেলে — মুহাম্মদ ﷺ।

কুসাই থেকে শুরু হওয়া একটা লাইন —

কুসাই ইবনে কিলাব
তার ছেলে আবদে মানাফ
তার ছেলে হাশিম
তার ছেলে আবদুল মুত্তালিব, যার আসল নাম ছিল শায়বা
তার ছেলে আবদুল্লাহ
তার ছেলে মুহাম্মদ ﷺ।

একটা ঘর, একটা চাবি, আর একটা বংশ — এভাবেই আল্লাহ মক্কাকে গুছিয়ে রাখছিলেন, তার শেষ নবীর জন্য।

সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

সীরাহ-৯
252006
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১২ সেপ, ২০২৬, ২১:০৬

Photo1/2
193002
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১১ সেপ, ২০২৬, ১৫:১১

হয়।

বহু বছর পরের কথা। ইয়েমেন তখনো পারস্যের হাতে, গভর্নর তখন বাজান। মদিনা থেকে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিসরার কাছে একটা চিঠি পাঠালেন। খসরু পারভেজ চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলল আর বলল, বাজানকে বলো এই লোকটাকে ধরে আনতে। বাজান দুজন লোক পাঠাল।

নবীজি তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ফিরে যাও। আজ রাতেই তোমাদের কিসরা খুন হয়েছে।"

লোক দুটো হকচকিয়ে গেল। পারস্য থেকে ইয়েমেনে খবর আসতে ত্রিশ দিন লাগে। আজ রাতের খবর আজই কীভাবে জানবে? কীভাবে সম্ভব তা? কী আজব কথা!

কিন্তু ঠিক চৌদ্দ দিন পর রাজকীয় ডাক এলো। চিঠিতে লেখা, কিসরা ঠিক সেই রাতেই খুন হয়েছে, যেই রাতের কথা মুহাম্মদ ﷺ বলেছিলেন।

ত্রিশ দিনের রাস্তা চৌদ্দ দিনে কীভাবে এলো? বাজানের হাত কাঁপতে লাগল। শরীরটা নড়ে উঠল। সে বুঝে গেল এটা কোনো মানুষের খবর না, এটা আসমান থেকে আসা খবর। সে আর দেরি করল না। সাথে সাথে কালেমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেল। তার সাথে পুরো ইয়েমেন মুসলিম হয়ে গেল।

নব্বই কেজির মুকুটটা শেষ পর্যন্ত টিকল না। ছিঁড়ে গেল। আর আটশো ফাঁসির আসামি দিয়ে শুরু হওয়া দখলদারি শেষ হলো একটা সত্য খবরের কাছে।

মক্কার কুরাইশরা চাঁদ দুই টুকরো হতে দেখেও বলেছিল "জাদু"। আর বাজান একটা সত্য তথ্য দেখেই ঘোষণা দিয়েছিল—আল্লাহ ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই, মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল।

আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক আলা মুহাম্মদ ﷺ।

#সীরাহ-৮
284008
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১১ সেপ, ২০২৬, ১৫:১১

ইয়েমেনের আকাশে তখন কালো মেঘ। মাঝেমধ্যে বজ্রধ্বনি। এক রাজপুত্র নিজের দেশেই ভাড়াটিয়া হয়ে ঘুরে বেড়ায়। নাম সাইফ ইবনে যি ইয়াজান। তার বাপ-দাদার সিংহাসনে বসে আছে হাবশীরা। তার নিজের বলতে কিছু নেই, শুধু একটা জেদ আছে — দেশটা ফিরে পেতে হবে। সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতেই হবে।

সে প্রথমে ছুটে গেল রোমে। বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বড় শক্তি। কায়সারের দরবারে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। আকুতিভরা কণ্ঠে বলল, "জাহাপনা, আমাদের বাঁচান। রাজার ছেলে ফকির হয়ে ঘুরছি দ্বারেদ্বারে। নিজের ঘরেই পরাধীন। উদ্ধার করুন মহাশয়। আপনি না পারলে আর কে পারবে এই দুনিয়ায়?"

মন গলল না রোমের বাদশাহর৷ কায়সার মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ হাবশীরা যে ইয়েমেনে ঢুকেছে, সেই হুকুমটা সে নিজেই দিয়েছিল। দাওসকে সে-ই বলেছিল নাজ্জাশির সহযোগিতা নিতে। নাজরানের খ্রিস্টানদের পোড়ানোর বদলা নিতে। যার কাছে বিচার চাইতে গেল, সে-ই তো ইয়েমেনি হিময়ারি সাম্রাজ্যের অবসানে মূল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল।

সাইফ বুঝল এখানে হবে না। সে পথ বদলাল। এবার গন্তব্য আরেক দুনিয়া কাঁপানো শক্তি — পারস্য।

পারস্যের রাজাকে বলা হতো শাহানশাহ— রাজাদের রাজা। তার দরবারে ঢোকা মানে একটা সাজানো ভয়ংকর নাটকে ঢোকা। রাজা একটি বিশাল মুকুট পরেন৷ সোনা, রুপা, হিরা, মুক্তা দিয়ে বানানো। ওজন নব্বই কেজি। এত ভারী যে, কোনো মানুষের ঘাড়ে বসবে না। বসালে বাঁচবে না৷ ওজনে থেঁতলে যাবে। তাহলে কী করে খসরু পারভেজ ৯০ কেজি ওজনের মুকুট পরে দরবার করে? এখানেই টুইস্ট।

ছাদ থেকে সোনার দড়ি দিয়ে ঝুলছে একটা মুকুট। সোনার দড়ি টেনে মুকুট উঁচু-নিচু করা হয়। দড়ি টানার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশিক্ষিত লোকও আছে। রাজা এসে তার আসনে বসলেই মুকুট ধীরেধীরে তার মাথা বরাবর নেমে যায়—কিন্তু মাথা স্পর্শ করে না৷ দূর থেকে মনে হয়, মুকুট পরেই যেন রাজা বসে আছে। দাপট দেখে মনে হয়, সে যেন আসমান থেকে ক্ষমতা নিয়ে সিংহাসনে উপবিষ্ট। পর্দা সরলেই দরবারে আসা সব রাজা, সব দূত ভয়ে সেজদায় পড়ে যায়।

সেদিন শুধু সাইফ পড়ল না। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। দরবারে ফিসফিসানি শুরু হলো। কিসরা রেগে বলল, এই বোকা কে? সেজদা করল না কেন? সাইফ তখন এমন একটা জবাব দিল যে পুরো দরবার চুপ হয়ে গেল। ভারাক্রান্ত সুরে বলল, "আমার দেশটা দখল হয়ে আছে, আমি ফেরারি ঘুরছি, সেই চিন্তায় আমি এতটাই ডুবে আছি যে আর কিছু খেয়ালই করিনি।"

কিসরা প্রথমে তাকে পাত্তাই দিল না। তার মন্ত্রীরা বলল, "আরব আবার একটা জায়গা নাকি? ফালতু এলাকা। খালি বালি আর পাথর, ওখানে গিয়ে কী লাভ? সাইফকে বিদায় করার জন্য কিসরা তাকে দশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে দিল, যেন সে চলে যায়।

আর এখানেই সাইফ তার আসল চালটা চালল। সে দরবার থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে সেই দশ হাজার মুদ্রা ফকিরদের মাঝে ছুঁড়ে দিয়ে দিল। কাজটা এমনভাবে করল, যেন এসব রৌপ্য মুদ্রা তার হাতের ময়লা৷ খবরটা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ল। কিসরা আবার ডেকে আনল তাকে। বলল, এত বড় বেয়াদবি কেন করলি?

সাইফ হেসে বলল, বেয়াদবি করিনি জাহাপনা। আপনাদের এই রৌপ্য আমার কাছে আসলেই ময়লা। আমার দেশ ইয়েমেনে সোনা রুপার পাহাড় আছে। রুপা আমাকে টানে না।

একটা মরুভূমিকে সে এক মুহূর্তে বানিয়ে দিল গুপ্তধনের খনি। আর পারস্যের লোভী চোখ চকচক করে উঠল।

তবুও কিসরা ছিল ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়। সে তার দামি সৈন্য দিল না। সে বলল, জেলখানায় আটশো লোক আছে, কাল সকালে যাদের ফাঁসি হবে। ওদের দিয়ে দাও। যদি ওরা জেতে, তাহলে একটা দেশ পেলাম। আর যদি মরে, তাহলে ফাঁসি দেওয়ার ঝামেলা থেকে বাঁচলাম। কোনো লস নাই।

আটশো ফাঁসির আসামি সারিবদ্ধ। সামনে এক বুড়ো কিন্তু কিংবদন্তি তীরন্দাজ জেনারেল ওয়াহরিজ। তার নেতৃত্বে বাহিনী চলল ইয়েমেনের দিকে।

আদেন বন্দরে যখন তারা নামল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাসরুক ইবনে আবরাহা। সে হাতির পিঠে। কপালে একটা লাল মুক্তা। ওয়াহরিজ সাইফকে জিজ্ঞেস করল, কোনটা নেতা? সাইফ আঙুল দিয়ে দেখাল। ওয়াহরিজ ধনুক তুলল না। অপেক্ষা করল। মাসরুক হাতি থেকে ঘোড়ায় নামল। ওয়াহরিজ তবুও তীর ছুড়ল না। মাসরুক ঘোড়া থেকে যখন খচ্চরে নামল, তখন ওয়াহরিজ হাসল। বলল, দেখো, ও হাতি থেকে খচ্চরে নেমেছে, ওর রাজত্বও এভাবেই নিচে নেমে গেছে। আর খচ্চর ধীরে চলে, নিশানা লাগানো সহজ।

তারপর পুরো বাহিনীর পেছন থেকে একটা তীর ছুটে এলো। একটা মাত্র তীর। সেই তীর গিয়ে মাসরুকের কপালে লাগানো লাল মুক্তাটা ভেদ করে তার খুলি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। একটা শব্দ হল, আর একটা সাম্রাজ্যের পতন হয়ে গেল।

সাইফ ভাবল, আমি স্বাধীন। এবার আমি রাজা হব। কিন্তু তখনই তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। পারস্যের লোকেরা বলল, রাজা? তুমি না। ইয়েমেন এখন থেকে আমাদের। আমরা এখানে আমাদের গভর্নর বসাব। যাদেরকে সে মুক্তির জন্য ডেকে এনেছিল, তারাই হয়ে গেল নতুন দখলদার। ইয়েমেনে আজও মানুষ এই ঘটনাকে বলে সাইফ ইবনে যি ইয়াজানের চুক্তি। মানে এমন এক চুক্তি যেখানে বাইরের সাহায্য নিতে গিয়ে নিজের ঘরটাই বিক্রি করে দেওয়া
228005
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১১ সেপ, ২০২৬, ১৫:১১

Photo1/2
202003
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১০ সেপ, ২০২৬, ২১:৪৬

তাকে দেখে আবরাহা সিংহাসন থেকে নেমে এলো। তার পাশে বসল। বলল, "বলো, কী চাও?"

আব্দুল মুত্তালিব বললেন, "আমার ২০০ উট ফেরত দিন।"

আবরাহা হতবাক। বলল, "আমি তোমাদের খোদার ঘর ভাঙতে এসেছি, আর তুমি উট চাইছ? তোমাকে অনেক বড় ভেবেছিলাম!"

আব্দুল মুত্তালিব চোখে চোখ রেখে বললেন, "আমি উটের মালিক, তাই উট চাইছি। আর এই ঘরের একজন মালিক আছেন। তিনি তার ঘরকে রক্ষা করবেন। আমার চিন্তা করতে হবে না।"

এই কথা শুনে আবরাহার বুকটা একবার কেঁপে উঠল। কিন্তু অহংকার তাকে থামাল না।

আব্দুল মুত্তালিব ফিরে এসে মক্কাবাসীকে বললেন, "সবাই পাহাড়ে উঠে যাও। কেউ ঘরে থেকো না। দেখো, তোমাদের রব কী করেন।"

তিনি নিজে কাবার দরজা ধরে কাঁদতে লাগলেন, "হে আল্লাহ! তোমার ঘর, তুমি বাঁচাও! আমি বুড়ো, আমার আর কিছু করার নেই!"

পরদিন সকাল। আবরাহা হাতিকে বলল, "চলো, কাবা ভাঙো!"

মাহমুদকে কাবার দিকে ঘোরানো হলো।

হাতি নড়ল না।

মাহুতরা মারতে লাগল। লোহার শিক দিয়ে খোঁচাতে লাগল। হাতি বসে পড়ল। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

তাকে ইয়েমেনের দিকে ঘোরালে সে দৌড়ায়। শামের দিকে ঘোরালে দৌড়ায়। কিন্তু কাবার দিকে ঘোরালেই সে পাথরের মতো বসে থাকে। যেন বলছে, আমি যেতে পারব না। ওটা আমার রবের ঘর।

বন্দী নুফাইল তখন হাতির কানে ফিসফিস করে বলল, "বসে থাকো মাহমুদ, বসে থাকো। এটা আল্লাহর ঘর।"

আবরাহা পাগল হয়ে গেছে। হাতি নিয়ে টানাটানি করছে।

ঠিক তখনই আকাশে একটা শব্দ হল। বিকট শব্দ।

সবাই উপরে তাকাল।

আকাশ কালো হয়ে গেছে। কিন্তু মেঘে নয়। পাখিতে। হাজার হাজার, লাখ লাখ ছোট ছোট পাখি। কুরআনের আবাবিল। মেঘের মতো ঘেঁষে ঘেঁষে উড়ছে।

প্রতিটা পাখির ঠোঁটে একটা পাথর, দুই পায়ে দুটো পাথর। পোড়া মাটির পাথর, সিজ্জিল।

এক সেকেন্ড। শুধু এক সেকেন্ড।

পাখিগুলো পাথর ফেলতে শুরু করল।

যার গায়ে একটা পাথর পড়ল, তার শরীর গলে গেল। মাথার হেলমেট ভেদ করে মাথা গলে গেল, বুক ভেদ করে পেট গলে গেল। মানুষগুলো এমন হয়ে গেল যেন গরুতে খাওয়া ভুসি।

৭০ হাজার সৈন্য। কয়েক মিনিটে শেষ। মাটিতে শুধু পচাগলা লাশ। লাশের কার্পেট বিছানো।

আবরাহার গায়েও পাথর পড়ল। তার শরীর থেকে মাংস খসে খসে পড়তে লাগল। আঙুল খসে পড়ল। সে পালাতে লাগল। দৌড়াতে দৌড়াতে ইয়েমেনে গিয়ে কুকুরের মতো মরল।

মক্কা বেঁচে গেল। কাবা বেঁচে গেল।

আর সেই বছরটাকে আরবরা নাম দিল, আমুল ফিল, হাতির বছর।

আর সেই হাতির বছরেই, যেদিন হাতি সেজদায় পড়ে গিয়েছিল, যেদিন আকাশ থেকে পাথর নেমেছিল, ঠিক সেই বছরেই আমিনার কোলে জন্ম নিল এক শিশু। যার জন্য আল্লাহ কাবাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

তার নাম মুহাম্মদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমাদের হৃদয়ের জমিতে তিনিই রাজা।

সীরাহ—৭
2160013
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১০ সেপ, ২০২৬, ২১:৪৬

নাজরানে সেদিন বাতাসও কাঁদছিল।

মাটি খুঁড়ে বিশাল গর্ত করা হয়েছে। ভেতরে আগুন। এমন আগুন যার শিখা আকাশ ছুঁয়েছে। রাজা যুনুয়াস সিংহাসনে বসে আছে। তার চোখে পাগলামি।

তার সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। কোলে শিশু, পাশে বৃদ্ধ মা। জল্লাদ চিৎকার করে বলছে — "বলো, আল্লাহকে ছাড়লাম! বললেই ছেড়ে দিব!"

একজন মা এগিয়ে এলো। কোলে দুধের শিশু। আগুনের তাপে শিশুটা কেঁদে উঠল। মায়ের পা কাঁপছে। সে কি ঝাঁপ দেবে?

তখনই কোলে থাকা শিশুটা কথা বলে উঠল। আল্লাহ তার মুখে ভাষা দিলেন। শিশুটা বলল, "মা, ভয় পেও না। ঝাঁপ দাও। তুমি হকের উপর আছো।"

মা ঝাঁপ দিল। তারপর আরেকজন। তারপর আরেকজন। সেদিন ২০ হাজার মানুষ হাসতে হাসতে আগুনে পুড়ে শহীদ হল—কিন্তু ঈমান ছাড়ল না।

সেই আগুন থেকে একজন পালিয়ে গেল। নাম তার দাওস। তার গায়ে পোড়া গন্ধ, চোখে আগুনের ছায়া। সে দৌড়াচ্ছে। তাকে এই নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে হবে।

সে গেল কায়সারের কাছে। রোমের সম্রাটের কাছে। পায়ে পড়ে বলল, "আমাদের বাঁচান! ঈসা আ.-এর ধর্ম যারা মানছে তাদেরকে কাতারে কাতারে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ব্যবস্থা নিন। আপনিও তো সেই একই ধর্মের অনুসারী!"

কায়সার মাথা নিচু করল। বলল, "ইয়েমেন অনেক দূর। আমার ঘোড়া সেখানে যাবে না। তুমি নাজ্জাশীর কাছে যাও। হাবশার রাজা, সে আমাদের ভাই।"

দাওস আবার দৌড়াল। মরুভূমি, পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে হাবশায়।

নাজ্জাশী সব শুনে কেঁপে উঠল। সে ৭০ হাজার সৈন্য দিয়ে দিল। বলল, "যাও, জালিমদেরকে শেষ করো।"

যুদ্ধ হলো। যু নুয়াস হারল। সে দেখল, চারদিক থেকে হাবশীরা ঘিরে ফেলেছে। ধরা পড়লেই গলায় শিকল।

সে পাগলের মতো ঘোড়া ছোটাল সমুদ্রের দিকে। সবাই চিৎকার করে বলছে, "থামো!" কিন্তু সে থামল না। ঘোড়া সহ সমুদ্রে ঝাঁপ দিল। ডুবে মরল। একটা জালিমের এমনই মৃত্যু হওয়া উচিত।

ইয়েমেন স্বাধীন হল। কিন্তু স্বাধীনতা বেশিদিন টিকল না। নতুন গভর্নর আরিয়াত হয়ে গেল আরেক জালিম।

আবরাহা নামে এক সেনাপতি সব দেখছিল। তার চোখে স্বপ্ন, সে রাজা হবে।

সে সৈন্যদের কানে কানে বলল, "আরিয়াত আমাদের দিয়ে নিজের পকেট ভরছে।"

সৈন্যরা ভাগ হয়ে গেল। এখনই গৃহযুদ্ধ বাধবে। তখন আবরাহা এগিয়ে এলো। বলল, "আমরা ভাই ভাই মারামারি করলে ইয়েমেনের মানুষ আমাদের মেরে তাড়াবে। চলো, আমি আর আরিয়াত লড়ি। যে জিতবে, সে রাজা।"

দুজনে মুখোমুখি। আরিয়াত তলোয়ার চালাল। আবরাহার নাকে লাগল। নাক কেটে দুই টুকরো হয়ে গেল। রক্তে তার মুখ ভেসে যাচ্ছে। তাই মানুষ তাকে বলত আল-আশরাম, নাক-কাটা।

কিন্তু আবরাহা হার মানল না। সে এক কোপে আরিয়াতের মাথা নামিয়ে দিল।

ইয়েমেনের মাটি আবার রক্তে লাল হল।

এই খবর যখন নাজ্জাশীর কানে গেল, সে রাগে সিংহাসন ভেঙে ফেলল। বলল, "আমি কসম করছি, আমি ইয়েমেনের মাটিতে পা রাখব, আর আবরাহার মাথা ন্যাড়া করে দেব!"

আবরাহার গলা শুকিয়ে গেল। নাজ্জাশী এলে সে শেষ।

তখন সে এক অদ্ভুত বুদ্ধি করল। সে নিজেই নিজের মাথা ন্যাড়া করে ফেলল। এক থলে ইয়েমেনের মাটি ভরল। আর তার কাটা চুল। পাঠিয়ে দিল নাজ্জাশীর কাছে। সাথে চিঠি, "হে বাদশা, আপনার কসম পূরণ হয়েছে। এই নিন ইয়েমেনের মাটি, এর উপর পা রাখুন। এই নিন আমার চুল, আমি ন্যাড়া হয়েছি।"

নাজ্জাশী হাসল। বলল, "ব্যাটা চালাক আছে। ঠিক আছে, তুই-ই রাজা।"

রাজা হয়ে আবরাহা ভাবল, নাজ্জাশীকে আরও খুশি করতে হবে। সে ইয়েমেনে এমন এক গির্জা বানাল যার সোনার ঝলকে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। নাম দিল কুলাইস।

তারপর ঘোষণা দিল, "হে আরবরা! তোমরা আর মক্কায় যেও না। ওটা তো পাথরের ঘর। আমার কুলাইসে আসো। হজ এখানে করো।"

আরবরা এই অপমান সহ্য করতে পারল না। আল-নাসি গোত্রের এক বেদুইন রাতের আঁধারে কুলাইসে ঢুকল। কেউ নেই। সে ভেতরে মলত্যাগ করল। কাঠির সাহায্যে দেয়ালে মল লাগিয়ে দিল। মল দিয়ে দেয়াল লিখন!

সকালে আবরাহা এসে এই দৃশ্য দেখল। তার মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে চিৎকার করে বলল, "এই কাজ কুরাইশরা করিয়েছে! কাবা আছে বলেই আমার গির্জার দাম নেই! আমি কাবা ভেঙে ফেলব! একটা পাথরও রাখব না!"

বিশাল বাহিনী রেডি হলো। সামনে মাহমুদ। বিশাল হাতি। এমন হাতি আরবরা জীবনেও দেখেনি। মাটি কাঁপছে।

মক্কার পথে দুজন বীর বাধা দিল। যু নাফার আর নুফাইল। কিন্তু ৭০ হাজারের সামনে তারা কী করবে? হারল। বন্দী হলো।

বাহিনী যখন তায়েফে পৌঁছাল, সাকিফ গোত্র কাঁপতে কাঁপতে এলো। বলল, "হুজুর, আমাদের লাত মন্দির ভাঙবেন না। আমরা আপনাকে মক্কার রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি।"

তারা আবু রিগাল নামে এক লোককে দিল। আবু রিগাল টাকার জন্য নিজের জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। মক্কার রাস্তা দেখিয়ে দিল। মক্কার আগেই আল্লাহ তাকে মেরে ফেললেন। আরবরা আজও তার কবরে থুতু দেয়, পাথর ছোড়ে।

মক্কার বাইরে এসে আবরাহা লুট শুরু করল। গরু, ছাগল, উট। তার মধ্যে আব্দুল মুত্তালিবের ২০০ উটও ছিল।

আব্দুল মুত্তালিব, সাদা দাড়ি, নূরের মতো চেহারা, ৮০ বছরের বুড়ো, কিন্তু পাহাড়ের মতো ব্যক্তিত্ব। তিনি আবরাহার তাঁবুতে গেলেন।
235004
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

১০ সেপ, ২০২৬, ২১:৪৬

Photo1/2
153002
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৮ সেপ, ২০২৬, ২১:৫১

Photo1/2
উপরের পরপর তিনটি পোস্টই ৬ষষ্ঠ পর্বের অংশ।
246005
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৮ সেপ, ২০২৬, ২১:৩৪

৫. একটি ঘটনার ভূরাজনৈতিক "ডমিনো ইফেক্ট"

আসহাবুল উখদুদের ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় নিপীড়নের ঘটনা হয়ে থাকে নি। এর প্রভাব ইয়ামানের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসেও ছড়িয়ে পড়ে।


বর্ণনা অনুযায়ী, দাওস নামের একজন ব্যক্তি এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যান এবং শামের শাসকের কাছে গিয়ে এই ভয়াবহতার সংবাদ দেন।


এই সংবাদ শেষ পর্যন্ত আবিসিনিয়ার নাজাশির কাছে পৌঁছে। নাজাশি ইয়ামানের মুমিনদের ওপর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়ায় সেখানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
আবিসিনিয়ার পক্ষ থেকে আরিয়াত ও আব্রাহার নেতৃত্বে ইয়ামানে অভিযান পরিচালিত হয়। এর ফলে হিমইয়ারি শাসনের অবসান ঘটে এবং ইয়ামানে আবিসিনীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।


পরবর্তীতে আব্রাহা ইয়ামান থেকে মক্কার দিকে অগ্রসর হয় এবং হাতির বাহিনী নিয়ে কাবা ধ্বংসের চেষ্টা করে—যে ঘটনা কুরআনে সূরা আল-ফিলে স্মরণীয় হয়ে আছে।

অর্থাৎ আসহাবুল উখদুদের ঘটনা কেবল একটি নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর কাহিনি নয়। এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সৃষ্টি করে।


একটি বালকের শাহাদাত যেন ইতিহাসের একের পর এক ডমিনো পড়ে যাওয়ার সূচনা করেছিল।
উখদুদের আগুন পেরিয়ে যে শিক্ষা
আসহাবুল উখদুদের ঘটনা সূরা আল-বুরুজে চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।

এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রভাবের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ হল অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়া নয়; বরং সত্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকা।

বালকটি এমন একটি সত্য বুঝেছিল, যা বাদশাহ বুঝতে পারে নি। জুলুম ও ভয় দিয়ে নির্মিত সাম্রাজ্য যত শক্তিশালীই মনে হোক, তার ভিত ভঙ্গুর। বাতিল সাম্রাজ্য ম্যাসাকার চালালেও সত্য ও আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত ঈমানকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে না।

বাদশাহ বালকটির দেহকে হত্যা করতে পেরেছিল। কিন্তু তার বিশ্বাসকে হত্যা করতে পারে নি। বরং তার মৃত্যুই সেই বিশ্বাসকে হাজারো মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিল।

আর এ কারণেই আসহাবুল উখদুদের কাহিনী শুধু অতীতের কোনো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি নয়। এটি প্রতিটি যুগের মানুষের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়—

আপনাকে যদি বেছে নিতে দেওয়া হয়—নীরব আপসের বিনিময়ে দীর্ঘ জীবন, অথবা সত্যের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ মুহূর্ত—আপনি কোনটি বেছে নেবেন?
228006
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৮ সেপ, ২০২৬, ২১:৩৪

দরবারি ব্যক্তি সুস্থ হয়ে প্রাসাদে ফিরে এল। এই সুস্থতার জন্য সে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছিল৷

রাজ্যের সব চিকিৎসা গ্রহণ করেছিল। জাদুকরদের যাবতীয় মন্ত্র-তদবিরের দ্বারস্থ হয়েছিল। কোনো কিছুই তাকে সুস্থ করতে পারে নি। শেষমেশ এক বালকের কয়েক শব্দের দোয়ার বরকতে সে পূর্ণ সুস্থ। এটা স্বাভাবিক কোনো ঘটনা ছিল না। রাজত্বের প্রতি হুমকি ছিল। রাজার একচ্ছত্র আধিপত্য ও আনুগত্যের প্রতি অশনি সংকেত ছিল। সঙ্গত কারণেই রাজার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। রাজ্যের ক্ষমতার সংকট তৈরি হল। 


কোনো জালিম রাজা তার প্রতিপক্ষকে সহ্য করে না। ইতিহাসের শুরু থেকে আজ অবধি একই ধারায় চলছে। জালিম বেপরোয়া হয় ক্ষমতার প্রতি কাউকে হুমকি মনে করলে। বর্তমানে যেমন আমেরিকা ওয়ার অন টেররের নামে ইসলামী সভ্যতাকে ম্লান করতে মরিয়া। যুনুওয়াসও তেমনই ছিল। আরো এক রত্তি বেশি বেপরোয়া ছিল।

বালককে হুমকি মনে করে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিল। সে ধরে নিল, এই বালক এভাবে তার কার্যকলাপ চালালে এই রাজ্যের সব প্রজা তার অনুগত হয়ে যাবে। তার বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে যাবে। রাজা হয়ে যাবে নিষ্প্রভ। 
যুনুওয়াস জুলুমের পথ বেছে নিল। বালককে ধরার পাশাপাশি বাদ দিল না বালকের সান্নিধ্য নেওয়া কাউকেই। যে সন্নাসীর কাছে একান্তে বিশ্বাস শিখেছিল সেই সন্নাসীকেও পাকড়াও করা হল। সবার ওপর চালানো হল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম অত্যাচার। 


৩. নিজের শাহাদাতকে সত্যের সর্বজনীন ঘোষণায় পরিণত করার কৌশল।


বাদশাহ বালকটিকে হত্যা করতে চাইল। কিন্তু একের পর এক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। 
কখনো পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করা হল, আবার কখনো সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় বালক প্রতিবারই বেঁচে গেল।
অবশেষে বাদশাহ যখন তাকে হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল, তখন বালক বুঝতে পারল—তার নিজের মৃত্যুকেই সে সত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘোষণায় পরিণত করতে পারে।

সে বাদশাহকে বলল, তাকে হত্যা করার একটি বিশেষ পদ্ধতি আছে।
বাদশাহকে সমগ্র জনগণকে একত্র করতে হবে।

তারপর বালকের নিজের তূণীর থেকে একটি তীর নিয়ে জনসম্মুখে তাকে লক্ষ্য করে বলতে হবে:

"বিসমিল্লাহি রাব্বিলগুলাম"

'বালকের প্রতিপালক আল্লাহর নামে।'
বাদশাহ তাই করল।

তীরটি বালকের শরীরে বিদ্ধ হল এবং সে শাহাদাতবরণ করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল সবচেয়ে বড় ঘটনা।
জনতা বুঝতে পারল—বাদশাহ নিজে বালককে হত্যা করতে পারে নি। তাকে হত্যা করতে হয়েছে বালকের প্রতিপালকের নাম উচ্চারণ করে।

রাজা হয়তো ভেবেছিল, সে বালককে হত্যা করেছে। কিন্তু বাস্তবে সে নিজের হাতেই নিজের মতাদর্শের পরাজয় ঘোষণা করল। নিজের বিরুদ্ধে নিজেই আওয়াজ উঁচু করল। 

জনতা একসঙ্গে ঘোষণা করল:

"আমরা এই বালকের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।"


একজন বালকের মৃত্যু তাই একটি গোটা জনগোষ্ঠীর ঈমানের জন্মের কারণ হয়ে দাঁড়াল। বালকের রক্তের ওপর তরতর করে জেগে উঠল ঈমানদীপ্ত আলোকিত সভ্যতা। 

রাজা একটি জীবন শেষ করেছিল; কিন্তু তার বিনিময়ে সে হাজার হাজার হৃদয়ে ঈমান জন্মের উপলক্ষ তৈরি করেছিল।


৪. কথা বলা শিশু ও আগুনের পরীক্ষায় ঈমানের বিজয়।


জনগণের মধ্যে ঈমান ছড়িয়ে পড়ার পর বাদশাহ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে ঈমানদারদের নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিল। বিশাল সব গর্ত খনন করে তাতে আগুন জ্বালানো হলো। যারা ঈমান ত্যাগ করতে অস্বীকার করল, তাদের সেই আগুনে নিক্ষেপ করা হল।


কুরআনের সূরা আল-বুরুজে এই ঘটনার উল্লেখ এসেছে। সেখানে অগ্নিখাতের অধিবাসীদের কথা বলা হয়েছে—যারা মুমিনদের আগুনে নিক্ষেপ করেছিল এবং তারা ছিল তাদের ঈমানের কারণে নির্যাতনকারী।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—সাফল্যের প্রকৃত সংজ্ঞা সম্পর্কে জানা। 


দুনিয়ার দৃষ্টিতে তারা পরাজিত। তারা বাঁচতে পারেনি। তাদের ঘরবাড়ি, জীবন, সম্পদ—সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে তাদের পরাজিত বলা হয়নি। কারণ তারা তাদের ঈমান বিক্রি করে নি। অল্প কয়েকদিন বেঁচে থাকার আশায় অনন্ত আখেরাতকে ভুলে যায় নি। 


এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তগুলোর একটি ছিল এক শিশুর মায়ের ঘটনা। আগুনের সামনে এসে মা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আল্লাহর কুদরতে তার শিশু কথা বলে তাকে দৃঢ় থাকতে উৎসাহিত করেছিল:
"মা, ভয় পেয়ো না। দৃঢ় থাকো। তুমি সত্যের ওপর আছো" এটি ছিল কোলের শিশুর ঈমানের এক চূড়ান্ত ঘোষণা।
আসহাবুল উখদুদের মানুষ আগুনে পুড়ে গেলেও তাদের বিশ্বাস পুড়েনি। তাদের মতাদর্শের কবর রচিত হয় নি। তারা দৈহিক নির্যাতনের শিকার হলেও আদর্শিক জয় নিশ্চিত করেছিলেন। তাদের শরীর পরাজিত হয়েছিল; তাদের আত্মা বিজয়ী হয়েছিল।

তাদের জন্য দুনিয়ার আগুন ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্যের প্রতি অবিচল থাকার পুরস্কার ছিল অনন্ত।
191007
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৮ সেপ, ২০২৬, ২১:৩৪

সীরাহ—৬

যে বালক এক রাজাকে হারিয়ে দিয়েছিল:


ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসে ক্ষমতা মাপা হতো রাজাদের বংশমর্যাদা আর তাদের জাদুর শক্তি দিয়ে। কিন্তু ইয়েমেন ও নাজরানের শেষ হিমইয়ারী যুগে এমন এক কাহিনীর জন্ম হল, যা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের ভিত্তিকেই ভেঙে দিয়েছিল। এটি হল আসহাবুল উখদুদ বা পরিখার অধিবাসীদের ঘটনা, যা জুলুমের ক্ষমতাকে উল্টে দেওয়ার এক অসাধারণ পাঠ।

এই পরিবর্তনের পটভূমি আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শাম থেকে আসা এক ক্রীতদাস সাধক ফিমিয়ন নাজরানে তাওহীদভিত্তিক খ্রিস্টধর্ম নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সাধারণ ক্রীতদাস ছিলেন না। তাঁর আলাদা প্রভাব ছিল। বিশ্বাসের পারত ছিল অত্যন্ত উঁচুতে। তিনি ছিলেন এমন এক সাধক, যার দোয়ায় একবার বজ্রপাতে পূজিত গাছ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। সেই আলো থেকেই আবদুল্লাহ ইবনে সামিরের নেতৃত্বে একদল মুমিন ইয়েমেনের গভীরে প্রবেশ করে। 

তখন রাজ্য শাসন করছিল যু নুয়াস। সে ছিল তার পিতা—যিনি কাবাকে প্রথম গিলাফ পরানো নেককার রাজা—তুব্বান আসআদের সম্পূর্ণ বিপরীত। পিতা যেখানে পবিত্রতাকে সম্মান করত, পুত্র সেখানে রাষ্ট্রীয় জাদুর অন্ধকার দিয়ে সবকিছুকে দমন করতে চাইত। পুরো বিপরীত চরিত্রের বাপ-ছেলে। বাপ যেখানে বিশ্বাসের ভিত গড়তেন, ছেলে সেখানে জাদুর প্রভাব দিয়ে বিশ্বাসের ভিত ধ্বংস করত।

এই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঝড়ের কেন্দ্রে ছিল এক বালক, যাকে তার মেধার কারণে রাজার প্রধান জাদুকরের উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বালকটি অন্য এক অভাবনীয় পথ বেছে নিল। এমন এক পথ যা শেষ পর্যন্ত এক রাজাকে আল্লাহর অস্তিত্বের অনিচ্ছুক সাক্ষী হতে বাধ্য করেছিল। 

কোনো সেনাবাহিনী বা রাজনৈতিক পদ ছাড়া একজন কিশোর কীভাবে আত্মত্যাগের মাধ্যমে একটি রাজ্যের পুরো বিশ্বাস ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে? উত্তর লুকিয়ে আছে ৫টি গভীর শিক্ষার মধ্যে।

১. সন্ন্যাসী, জাদুকর এবং আত্মার গুপ্তচরবৃত্তি।

বালকের শিক্ষা ছিল রাষ্ট্র বনাম আত্মার দ্বন্দ্বের এক ছোট্ট প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন সে পাহাড়ের চূড়ায় রাজার প্রধান জাদুকরের কাছে জাদু শিখতে যেত, কিন্তু তার পথ পড়ত ফিমিয়নের এক অনুসারী খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর ঘরের পাশ দিয়ে। এখান থেকেই শুরু হয় তার "বুদ্ধিবৃত্তিক গুপ্তচরবৃত্তি"।  

দিনে সে শিখত এমন এক "রাষ্ট্রীয় জাদুবিদ্যা" যার ভিত্তি ছিল ভয়, প্রতারণা ও মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
আর অন্যদিকে সে রাতে শিখত ঈসা আলাইহিস সালামের দ্বীন—যেখানে মানুষের আনুগত্য কোনো রাজা বা জাদুকরের প্রতি নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর প্রতি। এভাবেই তার সামনে তৈরি হলো একটি তৃতীয় পথ।

তবে এই পথ কোনো তাত্ত্বিক বিতর্কের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। বরং একটি ঘটনা তাকে সত্যের দিকে দৃঢ়ভাবে নিয়ে গেল।

কীভাবে?

একবার এক বিশাল হিংস্র জন্তু জনপথ আটকে দিল। জন্তুর ভয়ে মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেল। বালক কোনো জাদুর মন্ত্রের আশ্রয় নিল না। সে সত্য পথ চেনার জন্য একটি পাথর হাতে নিয়ে দোয়া করল: "হে আল্লাহ, যদি একেশ্বরবাদী সন্ন্যাসী ওই জাদুকরের চেয়ে তোমার কাছে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে এই জন্তুটিকে মেরে ফেলো।" 

এরপর জন্তুটি মারা গেল। এই ঘটনাকে বালকের জন্য সত্যের পথে তার প্রথম বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়।
সে বুঝে গেল—সত্যের পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষককে নয়, বরং বচেয়ে সত্য শিক্ষককে অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।

২. জাদুর বিপরীতে চিকিৎসা: প্রকৃত ক্ষমতার উৎস।

আল্লাহর প্রতি বালকের ভক্তি যত গভীর হল, তাকে এমন সব মোজেজা দেওয়া হল, যা রাজার জাদুকরদেরকে অকেজো করে দিল। সে অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীদের সুস্থ করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করত। আল্লাহ দোয়া কবুল করতেন। অসুস্থরা সুস্থ হয়ে যেত।


তার এই খ্যাতি একসময় বাদশাহর ঘনিষ্ঠ এক অন্ধ সভাসদের কানেও পৌঁছাল। সভাসদের একজন বালকের কাছে এসে চিকিৎসা চাইল। কিন্তু বালক নিজের জন্য কোনো অলৌকিক ক্ষমতার দাবি করল না।

সে স্পষ্ট করে বলল:

"আমি কাউকে সুস্থ করি না। আল্লাহই সুস্থ করেন।"

এই একটি বাক্যের মধ্যেই ছিল তার অবস্থানের মূল পার্থক্য। ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নিতে এই অস্বীকৃতি ছিল রাজার "জাদুর" ওপর সরাসরি আঘাত, কারণ রাজার জাদু টিকে ছিল ব্যক্তিগত অলৌকিক ক্ষমতার কল্পকাহিনী তৈরি করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার ওপর। 
বাদশাহর জাদু মানুষের সামনে এমন একটি ধারণা তৈরি করত যে, জাদুকরের নিজেরই অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই ভয় ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হত।

অন্যদিকে বালক মানুষকে শেখাল—ক্ষমতার প্রকৃত উৎস কোনো মানুষ নয়; একমাত্র আল্লাহ। 

বালকের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রাজদরবারের লোক অন্ধ ছিল। দোয়ার ফলে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। দীর্ঘদিনের অন্ধত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বালকের রবের ওপর ঈমান আনে।
205007
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

পৃথিবীর অন্য সব শহর গড়ে উঠেছে নদী, সমুদ্র, খনি বা উর্বর জমির উপর ভিত্তি করে—কিন্তু মক্কা গড়ে উঠেছে একটি ঐশ্বরিক আহ্বানের উপর ভর করে। সুতরাং মক্কার শক্তি কোনো প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, তার শক্তি হজ্জের আহবানে।

সেই ডাকেই মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে যুগের পর যুগ ধরে ছুটে আসছে। আসবে কিয়ামত অবধি। মক্কা এখন আর অন্য দশটা উন্নত শহর হিসেবে বা কেবল একটি বসতি হিসেবে থাকল না, এটি হয়ে গেল বিশ্বজনীন গন্তব্য, মানবতার মিলনকেন্দ্র।
186007
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

প্রথম পর্বের পর..

দ্বিতীয় মোড়: আরবি ভাষা ও একটি নতুন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্ম।

মক্কার আরব পরিচয়ের মূল ভিত্তি মূলত 'আল-আরব আল-মুস্তারিবা (العرب المستعربة) ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যারা মূলত আরব ছিল না, কিন্তু পরবর্তীতে আরব সংস্কৃতি ও ভাষা গ্রহণ করে আরবদের সাথে মিশে গেছে।

আমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) জন্মসূত্রে আরব ছিলেন না। তাঁর জন্ম হয়েছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) উর বা বাবেল অঞ্চলে। পরবর্তীতে তিনি হিজরত করে শাম (বর্তমান সিরিয়া ও ফিলিস্তিন) অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। তাঁর ভাষা ও সাংস্কৃতিক পটভূমি ছিল হিব্রু বা আরমীয় সেমিটিক ধারার।

হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মাতা হজরত হাজেরা (আ.) ছিলেন মিসরের অধিবাসী। ফলে ইসমাইল (আ.)-এর বংশগত ধারায় মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে উত্তর আফ্রিকার প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার মিলন ঘটেছে।

ইবরাহিম (আ.) যখন আল্লাহ নির্দেশে শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.) ও মাতা হাজেরা (আ.)-কে মক্কার নির্জন প্রান্তরে রেখে যান, তখন জমরজম কূপকে কেন্দ্র করে সেখানে বসতি স্থাপন করে জুরহুম গোত্র। এই জুরহুম গোত্র ছিল ইয়েমেন থেকে আসা বিশুদ্ধ বা আদি আরব, যাদেরকে বলা হত 'আল-আরব আল-আরিবা (العرب العاربة)’।

ইসমাইল (আ.) জনমানবহীন মক্কায় জুরহুম গোত্রের সামাজিক বন্ধনে বড় হন। তিনি তাদের কাছ থেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শেখেন এবং পরবর্তীতে এই গোত্রেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রক্তসূত্রে মেসোপটেমিয়া ও মিসরীয় ধারার হলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় তিনি পুরোপুরি আরব হয়ে ওঠেন।

এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধনের কারণেই ইসমাইল (আ.)-এর বংশধরদেরকে বলা হয় 'আল-আরব আল-মুস্তারিবা' অর্থাৎ যাঁরা অন্য সংস্কৃতি থেকে এসে আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে আরবে পরিণত হয়েছেন।

এপর্যন্ত এসে আমরা সভ্যতাগত গুরুত্বপূর্ণ একটা শিক্ষা পাই। একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি কিংবা একটি জাতিসত্তা সবসময় একক কোনো উৎস থেকে তৈরি হয় না। মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, বিবাহ, বসতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটি নতুন পরিচয় গড়ে উঠতে পারে। যেমনটা আমরা ইসমাইল (আ.)-এর বেলায় হতে দেখেছি।

একদিকে ছিল বাবা ইবরাহীম (আ.)-এর নবুওয়তি বংশধারা, অন্যদিকে আরবদের ভাষা ও সংস্কৃতি। এই দুটো উপাদান যুক্ত হয়ে এমন এক সভ্যতা গড়ে ওঠল, যা আজ অবধি বিশ্বের তাবৎ সভ্যতা থেকে আলাদা, প্রভাবশালী, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাকর।

অর্থাৎ মক্কার পরিচয় শুরু থেকেই ছিল বহুমাত্রিক মানুষের মিলনের ফল। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমাজের গল্প নয়। বংশ, ভাষা ও সংস্কৃতির এক অসাধারণ সমন্বয়ের গল্প।

তৃতীয় মোড়: কাবা নির্মাণ ও পৃথিবীর মানুষকে আহ্বান।

মক্কার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে তখন, যখন আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করলেন।
নির্জন, পানিশূন্য এক মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে পিতা-পুত্র মিলে নির্মাণ করলেন সেই ঘর, যা পরবর্তীতে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের কিবলা হয়ে উঠে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“(হে নবী) স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করাকালীন বলছিলেন, হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন।" — সূরা আল-বাকারা: ১২৭

এই মহান নির্মাণকাজের সাক্ষী হয়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মাকামে ইবরাহিম। কাবার দেয়াল নির্মাণের সময় ইবরাহিম (আ.) যে পাথরের উপর দাঁড়িয়েছিলেন, তাতে তাঁর পায়ের চিহ্ন বসে যায়। সেই পাথরটিই মাকামে ইবরাহিম নামে পরিচিত—যা কিয়ামত পর্যন্ত ত্যাগ ও আনুগত্যের এক জীবন্ত স্মৃতি হয়ে আপন জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকবে।

কিন্তু কাবা নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও একটি বড় প্রশ্ন ও উদ্বেগ থেকে গেল—এই প্রত্যন্ত মরুভূমিতে নির্মিত এই ঘরে মানুষ আসবে কীভাবে? যদি না-ই আসতে পারে তাহলে এই ঘর আবাদ হবে কীভাবে? এখানে না আছে ফসল, না আছে বাণিজ্যের আকর্ষণ—মানুষ কেন এই ঘরমুখী হবে?

তখন আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন:
"আর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং প্রত্যেক দুর্বল উটের পিঠে চড়ে, দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।" — সূরা হজ: ২৭

ইবরাহিম (আ.)-এর সামনে তখন শুধুই বিস্তীর্ণ মরুভূমি। কোথাও কেউ নেই। শত মাইলের ভেতরেও মানুষের পদচিহ্ন নেই। এমন জনশূন্য প্রান্তরে তাঁর কণ্ঠ কীভাবে পৌঁছাবে? এই প্রশ্নটা আমাদের মনে জাগলেও আমাদের পিতা ইবরাহীম (আ.) মনে জাগে নি। তিনি কোনো আপত্তি জানালেন না। তিনি ‘'সামি'না, ওয়া আতা'না (শুনলাম, মানলাম)”—এর আমল করলেন একনিষ্ঠ মনে।

এখানেই রয়েছে তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। মানুষের দায়িত্ব ছিল শুধু আহ্বান জানানো, আর সেই আহ্বান সৃষ্টির অন্তরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আল্লাহর। ইবরাহিম (আ.) যখন আবু কুবাইস পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আহ্বান দিলেন, আল্লাহ তাঁর আওয়াজ পৃথিবীর সমস্ত আত্মার কাছে পৌঁছে দিলেন। যাদের ভাগ্যে হজ লেখা ছিল, তারা সেদিন 'লাব্বাইক' বলে সাড়া দিয়েছিল। আর এখানেই তৈরি হয় মক্কার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
197007
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

Photo
201008
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

১. যেখানে সভ্যতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল না।

সভ্যতার ​ইতিহাস সাধারণত গড়ে ওঠে নীলনদের উর্বর পলিমাটিতে কিংবা টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের জীবন ধারণে উপযোগী তীরভূমিতে। সভ্যতার অংকুরোদগমের জন্য চিরকাল প্রয়োজন পড়েছে প্রবহমান নদী, উর্বর জমি, কৃষি আর প্রাকৃতিক শক্তির প্রাচুর্য।

মক্কার বেলায় তা ভিন্ন। মক্কার ইতিহাস শুরু হয়েছে ঠিক তার উল্টো মেরুতে। মরুর তীব্র খরতাপ আর রুক্ষ, ধূসর পাহাড়ঘেরা এক নিস্তব্ধ পাথুরে উপত্যকা মানুষের বসবাসের উপযোগী ছিল না মোটেও। যেখানে না ছিল এক ফোঁটা পানের জল, না ছিল কোনো কৃষিজমি, সেখানে কীভাবে নতুন এক সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে?

​আজ যে আধুনিক মক্কায় কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন এবং প্রতিমুহূর্তে যেখানে বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে গণমানুষের অবিরাম আগমন, কয়েক হাজার বছর আগে তা ছিল নিছক এক জনমানবহীন শূন্য প্রান্তর।

ইবরাহিম (আ.) যখন তাঁর সহধর্মিণী হাজেরা (আ.) এবং শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে এই প্রখর রৌদ্রদগ্ধ উপত্যকায় রেখে সমাধানের পথনির্দেশ না করে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন সেখানে ছিল না দৃশ্যমান কোনো জীবনের সম্ভাবনা। ছিল কেবল এক মায়ের অটল ধৈর্য আর নিষ্পাপ শিশুর পানের জলের আকুলতা।

কুরআনে ইবরাহিম (আ.)-এর প্রার্থনার ভাষায় সেই ভূমির যে পরিচয় ফুটে উঠেছে, তা চিরন্তন বাস্তবতা। দু'আতে তিনি বলেছিলেন, “হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করালাম।”—ইবরাহীম ৩৭

​স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—কোন অলৌকিক শক্তিতে এমন এক বৈরী পরিবেশে জন্ম নিল একটি স্থায়ী জনপদ? কোনো নদী বা প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকার ব্যবস্থা ছাড়া কীভাবে এই শুষ্ক উপত্যকা তৎকালীন প্রাচীন বিশ্বের বাণিজ্য কাফেলার প্রধান মিলনমেলায় পরিণত হলো? কীভাবে তা রূপ নিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ নগরীতে?

​মক্কার ইতিহাস আসলে প্রাকৃতিক সমৃদ্ধির গল্প নয়; বরং এটি ভৌগোলিক অসম্ভবকে জয় করার এক মহাকাব্যিক ইতিহাস। এটি এমন এক সভ্যতার গল্প, যার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল পানির এক আশ্চর্য ঝরনা, মানুষের আগমন, ভৌগোলিক অবস্থান, চুক্তি, তাওহিদ ও স্রষ্টার ওপর অগাধ আস্থার ওপর। এক রুক্ষ প্রান্তর কীভাবে বিশ্বইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল, সেই অলৌকিক যাত্রার মূল উত্তরগুলোই আমরা খুঁজব এই ইতিহাসজুড়ে।

প্রথম মোড়: একটি পানির ঝরনা এবং পাখিদের আকাশপথের সংকেত।

​মক্কার সভ্যতার সূচনা কোনো রাজার সিংহাসন কিংবা কোনো বাহিনীর বিজয়ের মাধ্যমে হয়নি। এর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপিত হয়েছিল এক ফোঁটা অলৌকিক পানির মাধ্যমে—যার নাম জমজম।

​শিশু ইসমাইল (আ.)-এর বুকফাটা তৃষ্ণা মেটাতে মাতা হাজেরা (আ.) যখন সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে আকুল হয়ে ছুটছিলেন, তখন আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর স্পর্শে শুষ্ক ধূলিকণা চিরে বেরিয়ে আসে অশেষ পানির ধারা।

নির্জন মরুভূমিতে একটি পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য এই জলধারা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ ব্যাপার। এটি কেবল তৃষ্ণা মেটানোর অলৌকিক কোনো ঘটনা ছিল না, বরং ছিল একটি বিশ্বজনীন সভ্যতার সূচনা।

​মরুভূমির যাযাবর মানুষরা জানত প্রকৃতির গোপন ভাষা। নানান সংকেত, রঙঢঙ দেখে তারা ফলাফল অনুমান করতে পারত। প্রখর খরতাপের আকাশে যেখানে পাখিরা বারবার চক্রাকারে ঘোরে, সেখানে নিশ্চয়ই পানির অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে—এই ধারণা তাদের বদ্ধমূল ছিল।

সেই প্রাচীন মরু-অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই ইয়েমেন থেকে আগত জুরহুম গোত্রের এক কাফেলা দূর থেকে পাখিদের ডানা মেলা দেখে পানির অস্তিত্ব অনুমান করে নিল।

​অনুসন্ধান চালাতে চালাতে তারা পৌঁছাল সেই উপত্যকায় এবং প্রত্যক্ষ করল প্রবাহিত জমজম আর তার পাশে একা দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী ও শিশুকে।

​এখানেই মক্কার ইতিহাসে রচিত হয় এক অসামান্য মানবিক অধ্যায়। জুরহুম ছিল তৎকালীন সময়ের এক পরাক্রমশালী ও সশস্ত্র গোত্র। মরুর বুকে শক্তিপ্রয়োগ করে নিঃসহায় এক নারীর কাছ থেকে পানির উৎস ছিনিয়ে নেওয়া মোটেও কঠিন ছিল না তাদের জন্য। কিন্তু তারা বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয় নি; বরং চরম নৈতিকতা ও সৌজন্য দেখিয়ে তারা হাজেরা (আ.)-এর কাছে বিনীতভাবে অনুমতি চেয়েছিল, যাতে পানির ব্যবহারের বিনিময়ে তারা সেখানে বসতি গড়ে তুলতে পারে।

​অর্থাৎ, মক্কার প্রথম নগর হয়ে ওঠার ইতিহাস কেবল অলৌকিকভাবে পানি পাওয়ার গল্প নয়। এটি মানবিক অধিকারের স্বীকৃতি, পারস্পরিক সম্মতি, শ্রদ্ধাবোধ এবং এক অনন্য সুশীল সহাবস্থানের ইতিহাস।
219006
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

আমাদের দেহে রক্তচাপ কমে গেলে, রক্তের ভলিউম হ্রাস পেলে বা রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা নিম্নগামী হতে থাকলে কিডনির কোষগুলো তা বুঝতে পারে। বুঝে নিশ্চুপ থাকে না। তড়িঘড়ি করে রক্তে রেণিন নামক এনজাইম নিঃসরণ করে। এই রেণিন লিভার থেকে আসা অ্যানজিওটেনসিনোজেনকে ভেঙে অ্যানজিওটেনসিন-১-এ রূপান্তর করে। পরবর্তীতে অ্যানজিওটেনসিন-১-কে রূপান্তর করে অ্যানজিওটেনসিন-২-তে। এটিই অ্যালডোস্টেরন নিঃসরণ করতে বিশেষ সঙ্কেত বহন করে।

অ্যালডোস্টেরন (Aldosterone) কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি (Adrenal gland) থেকে নিঃসৃত একটি স্টেরয়েড হরমোন। এটি কিডনিকে নির্দেশ দেয় রক্ত থেকে অতিরিক্ত পটাশিয়াম প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিতে এবং সোডিয়াম ও পানি পুনর্শোষণ করে রক্তে ধরে রাখতে।

রক্তে পানি ও সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে গেলে রক্তের মোট আয়তন (Blood volume) বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি রক্তচাপকে বাড়িয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসে।

সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি। রেনিন হচ্ছে একটা এনজাইম, অ্যালডোস্টেরন হচ্ছে হরমোন। দুটো মিলে হয় একটা টিম। তাদের টিমওয়ার্ক হচ্ছে:

রেনিন হলো সাইরেন বা সংকেতদাতা। শরীরে রক্তচাপ কমে গেলে রেনিন সতর্কবার্তা দেয় এবং অ্যালডোস্টেরন তৈরির পথ তৈরি করে।

​অ্যালডোস্টেরন হলো পলিসি বাস্তবায়নকারী। রেনিনের সংকেত পেয়ে সে কিডনি থেকে লবণ ও পানি শুষে নেয় এবং ক্ষতিকর পটাশিয়াম ফেলে দিয়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক করে।

আমাদের অজান্তেই ২৪ ঘণ্টা শরীরের ভেতরে রক্তচাপ ও তরলের ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য এই জটিল ব্যবস্থাটি নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমরাও সেই নেয়ামতের একদম ভুলে আল্লাহর নাফরমানি করেই যাচ্ছি।

রবের একচ্ছত্র আনুগত্যে ফিরে আসুন বেলা ফোরাবার আগেই!
4210016
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

Video
490002
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

ক. দি প্যারাডক্স অব ডেথ বা মৃত্যুর বিপরীত আকাঙ্ক্ষা।

দুনিয়ার বুকে মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু। এই মৃত্যুকে ঠেকাতে মানুষ কত আয়োজনই না করে! সম্পদ সঞ্চয় করে, চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, নিরাপত্তার জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কারণ সে বেঁচে থাকতে চায়, আরও কিছুদিন এই পৃথিবীর স্বাদ উপভোগ করতে চায়।

কিন্তু হাশরের ময়দানে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যাবে। মানুষ দুনিয়াকে আখেরাতের উর্বর শস্যক্ষেতে পরিণত করতে ব্যর্থ হলে বিচার শেষে তার আমলনামা বাম হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং সে নিজের ভয়াবহ পরিণতি চোখের সামনে দেখতে পাবে, তখন অনুশোচনায় চিৎকার করে উঠবে—"হায়! আমার মৃত্যুই যদি সবকিছুর শেষ হতো!" সে চাইবে, যদি মৃত্যুর পর আর কখনো জীবিত হতে না হতো! যদি মাটিতেই চিরতরে মিশে যেত!

কী নির্মম বৈপরীত্য! যে মৃত্যুকে একসময় সে সবচেয়ে বেশি ভয় করত, সেই মৃত্যুই তখন তার সবচেয়ে বড় কামনায় পরিণত হবে। কিন্তু তখন আর মৃত্যুও তাকে মুক্তি দেবে না। কারণ আখিরাত হলো চিরস্থায়ী জীবনের সূচনা, যেখানে পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

খ. দি ইলিউশান অব ওয়েলথ অ্যান্ড পাওয়ার বা দুনিয়ার দুটি শক্তির চরম ব্যর্থতা।

মানুষকে পথভ্রষ্ট করার সবচেয়ে বড় দুটি মোহ হলো, সম্পদ এবং ক্ষমতা। অনেকেই মনে করে, অর্থ থাকলে সবকিছু কেনা যায়, আর ক্ষমতা থাকলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু কিয়ামতের দিন এই দুই শক্তির প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পাবে। তখন মানুষ আফসোস করে বলবে—

﴿مَا أَغْنَىٰ عَنِّي مَالِيَهْ ۜ هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهْ﴾

"আমার সম্পদ আমার কোনো উপকারে এলো না। আমার সব ক্ষমতা ও প্রভাব আজ বিলীন হয়ে গেল।"

যে সম্পদের জন্য মানুষ হালাল-হারামের সীমা অতিক্রম করেছিল, যে পদ-মর্যাদা ও ক্ষমতার অহংকারে অন্যদের ওপর জুলুম করেছিল, আজ তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। কোটি কোটি টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসা, রাজপ্রাসাদ, রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা—সবকিছু এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যাবে। আল্লাহর আদালতে মানুষের সঙ্গে যাবে না তার সম্পদ বা প্রভাব; যাবে শুধু তার ঈমান ও আমল।

গ. স্পিরিচুয়াল অ্যান্ড সোশ্যাল ফেইলিউর বা জাহান্নামে যাওয়ার মূল দুই কারণ।

এরপর আল্লাহ তাআলা মানুষের এই ভয়াবহ পরিণতির মূল কারণও জানিয়ে দিয়েছেন। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই দুটি কারণ মানুষের জীবনের দুটি সম্পর্ককে নির্দেশ করে—একটি আল্লাহর সঙ্গে, অন্যটি সৃষ্টির সঙ্গে।

প্রথমত:
সে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে নি। নিজের রবকে অস্বীকার করেছে, তাঁর নির্দেশকে তুচ্ছ করেছে এবং তাঁর সামনে জবাবদিহির বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণ করে নি, তারা পরকালে চরমভাবে লাঞ্ছিত হবে।

দ্বিতীয়ত:
সে অভাবী মানুষকে খাদ্য তো দিতই না; বরং অন্যদেরকেও সাহায্য করতে কাউকে উৎসাহিতও করত না। অর্থাৎ তার হৃদয়ে ছিল না আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আবার ছিল না মানুষের প্রতি দয়া ও দায়িত্ববোধ।

এখানেই ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের ইবাদতের নাম নয়; ইসলাম মানুষের অধিকার রক্ষারও শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি অভাবী মানুষের কষ্ট দেখে নির্বিকার থাকে, এমনকি সমাজকেও তাদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে না, সে নিজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। এটা বিস্তৃত বিষয়। আলোচনা দীর্ঘ হবে এটা খোলাসা করতে।

ঘ. আলটিমেট আইসোলেশন বা চরম একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা।

দুনিয়ায় ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষের চারপাশে মানুষের অভাব হয় না। বন্ধু, অনুসারী, প্রশংসাকারী, তোষামোদকারী—সবসময় ভিড় লেগেই থাকে। মানুষ মনে করে, এই সম্পর্কগুলোই তার শক্তি।

কিন্তু হাশরের ময়দানে সেই সমস্ত মুখ অদৃশ্য হয়ে যাবে। সেখানে তার কোনো 'হামীম' অর্থাৎ অন্তরঙ্গ বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী কিংবা রক্ষাকারী থাকবে না। সে থাকবে সম্পূর্ণ একা, সম্পূর্ণ অসহায়।

শুধু তাই নয়, তার জন্য কোনো সম্মানজনক আপ্যায়নও থাকবে না। তার খাদ্য হবে গিসলীন বা জাহান্নামীদের ক্ষত থেকে নির্গত পুঁজ, যা ভক্ষণ করবে কেবল চরম অপরাধীরাই।

দুনিয়ায় যে মানুষ নিজেকে অপরাজেয় ভাবত, অসংখ্য মানুষের ভিড়ে নিজেকে শক্তিশালী মনে করত, আখিরাতে সে একাই দাঁড়িয়ে থাকবে তার রবের সামনে। সেদিন কোনো সম্পদ, কোনো ক্ষমতা, কোনো আত্মীয় কিংবা কোনো বন্ধু তার বিন্দুমাত্র উপকারে আসবে না। মুক্তির একমাত্র পথ হবে বিশুদ্ধ ঈমান, সৎ আমল এবং আল্লাহর রহমত।
462004
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

বাংলাদেশের মতো অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি একটা অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে বের হওয়ার আগপর্যন্ত এই জাতির কোনো মুক্তি নেই।

অন্ধ দলীয় আনুগত্য অনুন্নত দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল করে জাতীয় অগ্রগতিকে থমকে দেয়। রাজনীতি যখন নীতি ও আদর্শ ছেড়ে কেবল দলীয় সুবিধা বণ্টন ও ক্ষমতার টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হয়, তখন দেশ ক্রমাগত পেছাতে থাকে।

মেধা ও যোগ্যতার জায়গায় দলীয় আনুগত্য অগ্রাধিকার পাওয়ায় সিভিল সার্ভিস, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি নষ্ট হয়।

ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে কেবল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে আগের মেয়াদের ভালো উন্নয়ন প্রকল্প বা নীতিগুলো বাতিল করা হয়। এতে জাতীয় সম্পদের বিপুল অপচয় ঘটে।

দলের আশ্রয়ে থাকা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী টেন্ডার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। সমাজের সবচেয়ে জুলুমবাজ লোকও হয়ে যায় সামগ্রিক বিষয়ের নিয়ন্ত্রক। এসব লোকদের মুখে যত সুন্দর স্লোগানই থাকুক না কেন, কাজে "দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড়" প্রতিফলিত হয়। ফলে মুক্ত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়, পেশিশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোতে গবেষণা বা মানোন্নয়নের চেয়ে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন প্রধান হয়ে ওঠে, যা নতুন চিন্তাশীল নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ করে।

যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন ও নিরাপত্তার অভাবে দেশের সবচেয়ে দক্ষ তরুণ ও পেশাজীবী জনগোষ্ঠী বিদেশমুখী হতে বাধ্য হয়। বিদেশে না গেলেও তারা দেশের হয়ে কাজ করতে বা দেশের কল্যাণে এগিয়ে আসতে অনীহা প্রকাশ করে। মূল্যায়ন না থাকলে কেউ-ই কাজে একাগ্রতা ধরে রাখতে পারে না।

এই 'মরার ওপর খাঁড়ার ঘা' হিসেবে আবির্ভূত হয় পাঁচ অন্তর অন্তর বিশাল বাজেটের জাতীয় নির্বাচন। নিছক ভোট গ্রহণের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা মূলধনী বিনিয়োগ নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা স্থায়ী অবকাঠামোর মতো উৎপাদনশীল খাতে এই অর্থ ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদি রিটার্ন পাওয়া যেত। দেশ উন্নতির পথে একধাপ এগিয়ে যেত। এখন প্রতি পাঁচ বছর পর তিন ধাপ পিছনে চলে আসে।

নির্বাচনের আগে ও পরের কয়েক মাস নীতি পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থগিত থাকে। এমনকি এই সময়ে মূলধন পাচারের (Capital Flight) প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়।

নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বাজারে আসার ফলে সাময়িক ও কৃত্রিম মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, যা সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এটার প্রভাব নির্বাচনের পরও দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত থাকে। যেমন আমরা এখনো গেল নির্বাচনের কালো অর্থনৈতিক থাবা থেকে বের হতেই পারছি না। দিনদিন অবস্থার অবনতিই ঘটছে।

নির্বাচনে বিজয়ী হতে প্রার্থীরা যে বিশাল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন, ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেটিং, বেপরোয়া টেন্ডারবাজি ও সরকারি কেনাকাটায় চড়া মূল্য ধরে তা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে নির্বাচনের প্রকৃত ব্যয় আদতে বহু গুণ হয়ে জনগণের ওপরই বর্তায়।

৫ বছর পর পর ক্ষমতা বা নীতি পরিবর্তনের আশঙ্কায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা মেগা প্রকল্পগুলোর গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে মানুষ উন্নয়নের গালভরা গল্প শুনলেও বাস্তবে সেগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পায় না।

শক্তিশালী বিচার বিভাগ ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান না থাকলে নির্বাচন বিজয়ী দলের জন্য "বিজয়ী সব পাবে" লাইসেন্স হয়ে দাঁড়ায়, যা দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দখলদারিত্বকে প্রশ্রয় দেয়।

৫ বছরের নির্বাচনী মেয়াদের কারণে দলগুলো শিক্ষা, গবেষণা ও স্থায়ী অর্থনৈতিক কাঠামোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে সাময়িক পপুলিস্ট নীতি গ্রহণ করে।

সাধারণ মানুষের অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার চেয়ে কেবল ৫ বছর পর পর একটি ভোটাভুটির আয়োজনকেই 'গণতন্ত্র' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

শাসক দল বদলালেও অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট, প্রশাসনিক তোষামোদি ও দুর্নীতির মূল কাঠামো একই থেকে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।

মুক্তি?

লেজুড়বৃত্তিক ও অন্ধ আনুগত্যের কথিত রাজনীতির বিপরীতে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থাই বাংলাদেশের মতো একটা দেশকে বিপর্যয়ের গহবর থেকে টেনে তুলে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তার আগপর্যন্ত এই পাঁচ বছরী ধ্বংসাত্মক "ভোটকেন্দ্রিক গণতন্ত্র" শুধুই ধ্বংসই ডেকে আনবে। কখনোই স্থায়ী কোনো সমাধান এই সিস্টেমে নেই।
383002
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

Photo
এই রুহুল আমীন কি ওই রুহুল আমীন, যিনি হাসিনাকে 'কওমী জননী' উপাধি দিয়ে কওমী মাদ্রাসার শুভ্র চেহারায় কালিমা লেপ্টে দিয়েছিলেন?

যদি তিনিই হন, তাহলে এসব সেল-টেলের দিকে না তাকিয়ে থেকে "ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি" জপা ঢের ভালো।
472008
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৭ সেপ, ২০২৬, ০৯:৩৯

সুসময়ে আসলে মানুষ দুঃসময়ের স্মৃতি ভুলে যায়। ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি আসলে মানুষ তার অতীত ভুলে যায়। আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয় এবং উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণচিন্তা থেকে বের হয়ে এসে সংকীর্ণ গণ্ডিবদ্ধ দলীয় চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে যায়। আপনি পৃথিবীর ইতিহাসের অলিগলি চষে একটা জিনিসই পাবেন, প্রত্যেক জালিম তৈরি হয়েছে তার সেরা সময়ে। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক এই ইস্কেলেশন তার চূড়ান্ত ধ্বংস ঢেকে আনে। ঠিক একারণে ইসলামী দর্শনে ক্ষমতা বা সুসময়কে একাধারে আমানত ও পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উত্তাল নদীতে নৌকা যখন ঝড়ো হাওয়ার কবলে পড়ে ডুবুডুবু অবস্থায় থাকে তখন আরোহীরা রবের দরবারে নতজানু হয়। আল্লাহকে ডাকেন কায়মনোবাক্যে। মুখে আল্লাহর নাম ছাড়া দ্বিতীয় কিছুই থাকে না। সেই একই নৌকা যখন শান্ত নদীতে চলে তখন আরোহীরা গান গায়, বাদ্য বাজায়, আমোদ করে, মদ খায়, নাচে মিউজিকের তালেতালে। এমন ভাবে থাকে, যেন তাদেরকে পাকড়াও করার কেউ নেই। ডুবতে থাকা নৌকার ইতিহাস ভুলে প্রবৃত্তির দাস হয়ে সীমালঙ্ঘন করে। আল্লাহ কুরআনে এই শ্রেণির উদাহরণ নিয়ে এসেছেন। সূরা ইসরার ৬৭ নাম্বার আয়াতে পাবেন।

আল্লাহ বিপদ দিয়েও বান্দাকে দেখেন, বিপদ দূর করেও বান্দার মানসিকতা মাপেন। বিপদে পতিত বান্দারা সাধারণত আনুগত্যশীল থাকে। শুইতে, বসতে, উঠতে আল্লাহকে ডাকে। রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ে। সেই একই বিপদ দূর হয়ে গেলে বেপরোয়া হয়ে যায়। যাকে ভালো লাগে না তাকে বধ করার চিন্তা করে। অন্তত কোণঠাসা করে রাখার সবধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। যে পথ তার অনুসৃত পথের মতো নয় সেই পথও চিরতরে বন্ধ করে দিতে চায়। এক্ষেত্রে ইসলাম কী বলে, তা দেখার সময় তার নেই। কারণ সে আছে এখন সুসময়ে। এই শ্রেণির উদাহরণ আল্লাহ কুরআনে নিয়ে এসেছেন। সূরা ইউনুসের ১২ নাম্বার আয়াতে বিস্তারিত পাবেন। এই প্রকারের মানুষদেরকে আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

আমি নিজে ইসলামিক। সুসময়ে আমি যার বিরুদ্ধে লেগে যাচ্ছি সেও ইসলামিক। এই ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব আমাদেরকে সাময়িক সুখ দিলেও ছিন্নভিন্ন করেই ছাড়বে। একদিন আফসোস করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ থাকবে না। কারণ আল্লাহ কখনোই এমন ইসলামিকদের হাতে ইসলামের নামে ক্ষমতা দেবেন না। ইতিহাসে এমন নজির নেই।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে গড়া সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ক্ষমতার ব্যাপারে এতটাই সতর্ক, ভীত ও দায়িত্বশীল ছিলেন যে, আজকের দিনে তা ভাবলেও অবাক হতে হয়। ক্ষমতা বা সুসময়কে তারা কোনো 'পুরস্কার' বা 'মর্যাদা' মনে করতেন না, বরং এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল 'বোঝা' এবং 'দায়িত্বে বেখেয়াল হলে জাহান্নামের কারণ হতে পারে' এমন এক পরীক্ষা হিসেবে দেখতেন। আর আমরা দেখি প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে।

হযরত আলী (রা.) যখন খলিফা তখন তাঁর একটি মূল্যবান বর্ম হারিয়ে যায়। পরে তিনি সেটি এক ইহুদির কাছে পান। খলিফা হিসেবে তিনি চাইলে ক্ষমতা খাটিয়ে বর্মটি কেড়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে সাধারণ নাগরিকের মতো কাজী (বিচারক) শুরাইহ-এর আদালতে মামলা করেন। ​আদালতে খলিফা তাঁর পক্ষে কোনো উপযুক্ত প্রমাণ বা সাক্ষী দিতে না পারায় বিচারক ইহুদির পক্ষে রায় দেন। খলিফা হাসিমুখে সেই রায় মেনে নেন। ইসলামের এই পরম ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার নির্মোহ রূপ দেখে সেই ইহুদি তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

আর আমরা একটু সমালোচনা শুনলেও হজম করতে না পেরে সমালোচনাকারীদের মূলোৎপাটন করতে যত ধরনের ষড়যন্ত্র, মিথ্যাচার, তোহমদ ও ট্যাগিং আছে, সবই ব্যবহার করি। এগুলো করার শেষে বলি, আমরা রাসূল ﷺ-এর দেখানো পথ এবং সাহাবীদের আমলে অবিচল। আল্লাহ কিয়ামতের দিন আমাদের এই মিথ্যাচারের হিসাবও নেবেন।

ইসলামের সুমহান আদর্শ যেন আজ ইসলামিক দাবিকারী গোষ্ঠী, ব্যক্তি বা দল দ্বারাই নিঃশেষ হচ্ছে।
6340011
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

০৬ সেপ, ২০২৬, ১৮:২৭

এই দখলদারিত্বের অবসান ঘটান যুনুওয়াস। তিনি তুব্বান আস'আদের বংশধর। গোপনে প্রাসাদে ঢুকে লোকানো অস্ত্র দিয়ে লাখনিয়াকে হত্যা করেন।
এই যুগ একটা কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়। শাসনব্যবস্থা যখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে, তখন সুযোগসন্ধানী অপরাধীরাও সহজে গোটা সমাজের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। এজন্যই শাসক প্রচণ্ড জালিম না হলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করা উচিত নয়।

৪. দাস ও বজ্রপাত: নাজরানে খ্রিস্টধর্মের আগমন

আরবের ধর্মীয় পরিবেশ সবসময় রাজার ফরমানে বদলায়নি। অনেক সময় বদলেছে সমাজের প্রান্তিক মানুষের বিশ্বাসের জোরে।
নাজরানে খ্রিস্টধর্ম পৌঁছায় ফেমিয়নের হাত ধরে। তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদী। ঈসা আ.-এর অনুসারী। আফ্রিকার এক দস্যুদল তাঁকে বন্দি করে আরবে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়।

ফেমিয়ন ত্রিত্ববাদ মানতেন না। তাঁর অমোঘ বিশ্বাস ছিল, ঈসা আল্লাহর পুত্র নন, তিনি একজন রাসুল মাত্র। দাস হয়েও তাঁর ইবাদত ছিল এত গভীর যে তাঁর মালিক নাকি এক রাতে এবাদতরত অবস্থায় তাঁকে ঘিরে এক রহস্যময় আলো দেখেন।

ফেমিয়ন যখন নাজরানের পৌত্তলিক বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করলেন, তখন স্থানীয়রা ফুঁসে উঠল। তারা একটি বিশাল গাছ দেখাল। তারা সেই গাছকেই পূজা করত। ফেমিয়ন একটা পরীক্ষা প্রস্তাব করলেন। বললেন, তাঁর রব যদি গাছটি ধ্বংস করেন, তবে তারা তাঁর বার্তা মেনে নেবে। স্থানীয়রা প্রস্তাব গ্রহণ করল।
ফেমিয়ন প্রার্থনা করলেন। হঠাৎ বজ্রপাত হল। গাছটি পুড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

এই একটি ঘটনায় নাজরানের অনেক মানুষ ধর্মান্তরিত হয়। শহরটি হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টান কেন্দ্র। একজন মানুষের বিশ্বাস, তার সামাজিক অবস্থান যত নিচুই হোক, একটা গোটা অঞ্চলের ইতিহাস বদলে দিতে পারে। এটাই এখানকার শিক্ষা।

যা বুঝতে পারলাম:

এই কাহিনিগুলো শুধু প্রাচীন রাজাদের গল্প নয়। এগুলো সেই পটভূমি, যেখানে পরে মহানবী মুহাম্মদ ﷺ আবির্ভূত হন। ফেমিয়নের প্রভাব এত দীর্ঘস্থায়ী ছিল যে, বহু শতাব্দী পর নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে মহানবী ﷺ-এর সাথে সাক্ষাৎ করে। সূরা আলে ইমরানের তাফসিরে এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

ইসলামপূর্ব আরব ছিল এক জটিল ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক মোজাইক। সেখানে ছিল মূর্তিপূজক, ইহুদি, খ্রিস্টান — সবাই। এই দীর্ঘ ইতিহাসের ধর্মান্তর, সংঘাত আর পরিবর্তনের পথ ধরেই মহানবী ﷺ-এর সাথে এসব সম্প্রদায়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

একদিকে এক রাজা, যিনি ঘুমাতে পারতেন না। অন্যদিকে এক দাস, যিনি একটি শহরের ধর্মীয় পরিচয় বদলে দিলেন। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়: ইতিহাসের গতিপথে কোনটির শক্তি বেশি — নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মানসিক মূল্য, নাকি একজন মানুষের অটুট বিশ্বাস?
2540011
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

২৩ আগ, ২০২৬, ০৩:২৭

আমরা সবকিছুকে ষড়যন্ত্রের চোখে দেখতে দেখতে এখন সত্যিকার অন্যায় বা নীতিবহির্ভূত কাজ কেউ দেখিয়ে দিলেও ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখি এবং প্রতিহত করার ক্যাম্পেইন করি। চোখে ভাসে শুধুই কন্সপিরেসি।

অথচ ইসলাম এই ধরনের মানসিকতাকে কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। আমরা ইসলামের হেফাজতের কথা বলে বলে নিজেরাই ইসলামের আদর্শ জলাঞ্জলী দিচ্ছি অনেকক্ষেত্রে। জানি না আমাদের হুঁশ কবে ফিরবে। নিজেদেরকে অতি বিশুদ্ধবাদী করে সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা, তা আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতি মারাত্মক ব্যহত করবে।

প্লিজ, আপনার অঞ্চলে আপনি শক্তিশালী হোন। এক ভোরে ফাতাহ করে ফেলার ক্ষতিকর চিন্তা থেকে ফিরে আসুন।
508007
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

২৩ আগ, ২০২৬, ০৩:২৭

Video
নেত্রকোনা ২ আসনের এমপি ডা. আনোয়ারুল হকের সংসদে দেওয়া বক্তব্যে কওমী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র খুঁজতে যাবেন না। পতিত সরকারের আমলে দেওয়া বক্তব্যের মতো বক্তব্য ছিল না মোটেও। সবকিছুকে ষড়যন্ত্রের লেন্সে দেখলে সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব হবে না। ভবিষ্যতে শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যাও কমে যাবে।

তিনি যা বলেছেন, যেভাবে বলেছেন তা অনেকটাই সত্য। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান দ্বারাই সবচেয়ে বেশি দুর্নাম হচ্ছে। কোনোমতে পাশ করেই দরস-তাদরিসের সাধারণ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ না নিয়েই দুই-তিন রুম ভাড়া নিয়ে আজগুবি সাইনবোর্ড লাগিয়ে মাদ্রাসা খোলার হার বহুগুণ বেড়েছে। এগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই জরুরি। এই পয়েন্টে দ্বিমত থাকার কারণ নেই। জাস্ট আলোচনা হতে পারে নিয়ন্ত্রণ নীতিমালার প্রসেস এবং বাস্তবায়নের রূপ নিয়ে। সরকার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলে বাধা দেওয়া এবং নিজেদের কন্ট্রোলিং পাওয়ারকে শাণিত ও আধুনিক করা কওমী নীতিনির্ধারণী বোর্ডের জন্য জরুরি।

সত্য এবং বাস্তব চিত্র যে-ই তুলে ধরুক, মেনে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
5380010
Nazrul Islam logo
Nazrul Islam

২৩ আগ, ২০২৬, ০৩:২৭

জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষমতা রাখেন। ফলে আইনি মারপ্যাঁচে মামলা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ থাকে না।

সুতরাং শর'ঈ আইনে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা সাধারণত ঘটে না। কারণ, সেখানে আইনজীবীদের মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর যুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই এবং বিচারক নিজেই সত্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। অপরাধ প্রমাণিত হলে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা এবং মজলুমকে দ্রুত ইনসাফ দেওয়া ইসলামী বিচারের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ঠিক একারণে শর'ঈ কোর্টে দ্রুত রায় হয় এবং যেকোনো সময়ক্ষেপণ ছাড়াই রায় কার্যকর করা হয়।
675002

Showing 30 of 46 posts

রেটিং

লগইন প্রয়োজন

Frequently Asked Questions

Nazrul Islam টেলিগ্রাম চ্যানেল কী বিষয়ে?+

Nazrul Islam (@nazruldew) tgdio-এ ধর্ম ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল। র‍্যাঙ্কিং, রেটিং, রিভিউ ও সাম্প্রতিক পোস্ট দেখে সাবস্ক্রাইব করার আগে সিদ্ধান্ত নিন। এখন tgdio-এ প্রায় ২,২২৫ সাবস্ক্রাইবার আছে।

আমি কীভাবে Nazrul Islam (@nazruldew) জয়েন করব?+

tgdio-এ চ্যানেল প্রোফাইল খুলে Join / Open in Telegram দিয়ে @nazruldew-এ বিনামূল্যে সাবস্ক্রাইব করুন।

Nazrul Islam কি ভালো ধর্ম চ্যানেল?+

tgdio-এ জয়েনের আগে Nazrul Islam-এর রেটিং, রিভিউ, র‍্যাঙ্কিং ও পোস্ট দেখুন। এখন tgdio-এ প্রায় ২,২২৫ সাবস্ক্রাইবার আছে। একই ধর্ম চ্যানেলের সাথে তুলনা করুন।

Nazrul Islam-এর স্ট্যাটস ও পোস্ট কোথায় দেখব?+

tgdio-এ @nazruldew পেজ খুলুন — সাবস্ক্রাইবার স্ট্যাটস, র‍্যাঙ্কিং, রেটিং ও পোস্ট। Stats লিঙ্ক দিয়ে গ্রোথ চার্ট দেখুন।