এভাবে খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা অনেক দূর চলে গেলেন। সেই বছরটা ছিল ঘোর অজন্মার। চারদিকে খাইখাই রব। মুখে খাবার ছিল না। পরনে ভালো কাপড় ছিল না। গাছে ফুল-ফল ছিল না। খেতখামারে ফসল ছিল না। উটের পালানে দুধ ছিল না। মেষগুলো ক্ষুধার জ্বালায় হাঁটতে পারছিল না। আকাশে মেঘ ছিল না। বৃষ্টি হওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিল না। সূর্যের তাপে পুড়ছিল সবকিছু। গাছ শুকিয়ে কাঠ হয়েছিল। মানুষ না খেতে খেতে শুকিয়ে কংকালসার হয়েছিল। চরম অশান্তি চারদিক থেকে অক্টোপাসের মতো ঝাপটে ধরেছিল।
বহু পথ, বহু মোড় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এক দুধ-শিশুর সন্ধান তাঁরা পেল। সেই শিশুকে নেওয়ার জন্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সে বলে, আমি নিব। ও বলে, আমি নিব। এই এক আজব প্রতিযোগিতা। কিন্তু যখন তাঁদেরকে জানানো হয় যে, শিশুটির পিতা নেই তখন আর কেউ নিতে চায় নি। কেউ না। মুখ কালো করে ফিরে আসে। পিতার কাছ থেকে ভালো পারিতোষিক তাঁরা আশা করতো। অথচ পিতা নেই। কার কাছে চাইবে টাকা? কে পূরণ করবে তাঁদের দাবী দাওয়া? শুধু শুধু নিয়ে কী লাভ? এমনিই চলছে মহা অভাব। কেউ নেয়নি। অন্যদিকে চলে গেল— ভিন্ন মহল্লায়।
বহু খোঁজাখুঁজির পর একসময় ঐ দলের সবাই এক একটি করে দুধ-শিশুর সন্ধান পেয়ে যায়—কিন্তু আবু যুয়াইবের কন্যা একটিও পায় নি। খালি হাত। মনটা ভীষণ বেজার। সে তাঁর স্বামীকে বললো ' ওগো! আমার শূন্য হাতে ফিরে যেতে একদম ভালো লাগছেনা। আল্লাহর কসম!! আমি ঐ এতিম শিশুকেই নিব।'
স্বামী জবাব দিলেন, 'নিতে পার। হয়ত আল্লাহ তাঁর মধ্যেই তোমার জন্য কল্যাণ রেখেছেন।'
স্বামীর সম্মিত পেয়ে আবু যুয়াইবের কন্যা সোজা চলে গেলেন এতিম শিশুর বাড়িতে। দাদা আর মা'র সাথে কথা পাকা করে কোলে তুলে নিলেন শিশুকে। শিশুকে কোলে নেয়ার সাথে সাথে তাঁর বুক দুধে ভরপুর হয়ে গেল। অথচ একটু আগেও সাথে থাকা বাচ্চা একফোঁটা দুধ বের করতে পারে নি। কতোবার চুষেছে আর কেঁদেছে সেই হিসাব কে রাখে? ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করেছিল। এখন নিজের বাচ্চা আর পালক বাচ্চা দুধ খেয়েও শেষ করতে পারছে না।
তাঁরা উটের কাছে গিয়ে দেখেন দুধে ফুলে গেছে উষ্ট্রীর পালান। যেই গাধায় চড়ে তিনি এসেছিলেন সেই গাধা এখন নওজোয়ান। কী শক্তি, কী তেজ, কী ক্ষিপ্রতা! সবার আগে চলতে লাগল সেই দুর্বল গাধা। বাড়িতে গিয়ে দেখে মেষ পালের বিরাট পরিবর্তন। প্রতিটি মাদী মেষের পালান দুধে ভর্তি। কী আনন্দ, কী স্বাচ্ছন্দ্য! তাঁদের হাসি থামছেইনা!
অন্যদের সেই করুণ অবস্থা তখনো বিরাজমান। হাহাকার লেগেই আছে। এভাবেই এই ছোট শিশুর বরকতে তাঁর সংসার প্রাচুর্য, সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠলো। সে হলো অনন্য। পৌঁছে গেল অনন্য উচ্চতায়-- দুনিয়া এবং আখেরাতে।
সেই ভাগ্যবান মহিলা--- হযরত হালিমা রা. আর সেই মহামান্য শিশু আমাদের প্রাণের নবী হযরত মুহাম্মদ সা.।
মুহাম্মদ ﷺ তখনও নবী হননি। তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়নি। পৃথিবীর মানুষ তখনও জানত না, এই ছোট্ট শিশুটিই একদিন শেষ নবী হিসেবে সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়াতের বার্তা নিয়ে আসবেন।
কিন্তু তাঁর জীবনের একেবারে শুরু থেকেই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের কিছু নিদর্শন প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। মরুভূমির নীরব বুকে বনু সা'দের সেই ছোট্ট পরিবারে এক এতিম শিশু বেড়ে উঠতে লাগলেন।
তাঁর চারপাশের মানুষ তখন শুধু একজন শিশুকে দেখছিল। এই শিশুই যে একদিন অন্ধকার জমিনে আলোর মশাল জ্বালাবেন, সেই বোধটুকু ছিল না তাদের। কিন্তু আল্লাহ জানতেন—এই শিশুর জন্য অপেক্ষা করছে এক বিশাল ভবিষ্যৎ। তাঁর দাপটেই কাঁপবে রোম, পারস্য সহ তৎকালীন সব পরাশক্তি।
একদিন তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হবে তাওহিদের আহ্বান। তাঁর হাতে মানুষ পাবে কুরআনের আলো। তাঁর জীবন হয়ে উঠবে মানবতার জন্য আদর্শ। আর তাঁর নাম উচ্চারিত হবে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাঁর নাম শুনেই আবেগে কাঁদবে কোটি মুসলিম। 'মুহাম্মদ' শোনার পরপরই অতি সম্মানের সাথে সমস্বরে বলে উঠবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মুহাম্মদ ﷺ-এর শৈশবের সেই প্রথম দিনগুলো তাই শুধু শৈশবের গল্প নয়। এগুলো এক মহামানবের আগমনের পূর্বকথা। এক মহান দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত হতে থাকা এক শিশুর জীবনের প্রথম অধ্যায়।










